কিছু মানুষ আসেন ধরাধামে নিজেদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের বৃত্ত অতিক্রম করে সমাজকে আলোকিত করতে। সমাজ ও মানুষের কল্যাণে নিবেদিত তেমনই এক মহৎ প্রাণ ছিলেন আলহাজ্ব আব্দুর রাজ্জাক সাহেব। গত ৬ অক্টোবর মঙ্গলবার সকালে সাড়ে দশটায় ৮০ ছাড়ানো এই প্রাজ্ঞ ব্যক্তিত্ব আমাদের ছেড়ে চিরবিদায় নেন (ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তিনি রেখে গেছেন অসংখ্য গুণগ্রাহী, ছাত্র-ছাত্রী এবং একটি আলোর মিছিলে সমৃদ্ধ জনপদ।
জন্ম ও শিক্ষার প্রারম্ভিক অধ্যায়:
১৯৩৭ সালের ৩০ শে নভেম্বর তদানীন্তন ব্রিটিশ ভারতের ত্রিপুরা জেলার (বর্তমান কুমিল্লা) মুরাদনগর থানার অন্তর্গত বিষ্ণুপুর নামের এক অজপাড়াগাঁয়ে জন্মগ্রহণ করেন আব্দুর রাজ্জাক সাহেব। বাল্যকাল থেকেই শিক্ষার প্রতি তাঁর ছিল অদম্য অনুরাগ। ১৯৫৪ সালে বাঙ্গরা উমালোচন উচ্চবিদ্যালয় থেকে ইস্ট বেঙ্গল সেকেন্ডারি এডুকেশন বোর্ডের অধীনে কৃতিত্বের সঙ্গে প্রথম বিভাগে মেট্রিকুলেশন পাস করেন। এরপর স্থানীয় শ্রীকাইল কলেজ থেকে আই.কম সম্পন্ন করার পর ১৯৫৬ সালে কলেজটি সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তিনি সুদূর ঢাকায় পাড়ি জমান। আর্থিক সঙ্কটের কারনে তিনি তদানীন্তন একাউন্ট্যান্ট জেনারেলের অফিসে একটি চাকুরী নেন। প্রতিকূলতার মাঝেও তিনি দমে যাননি; ১৯৫৮ সালে ঐতিহাসিক জগন্নাথ কলেজ থেকে রাতে ক্লাস করে বি.কম ডিগ্রি অর্জন করেন।
কর্মজীবন ও দূরদর্শী চিন্তা:
শিক্ষা সম্পন্ন করার পর ১৯৬০ সালে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তৎকালীন ওয়াপদায় (বর্তমানে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড) চাকরিতে যোগ দেন। ১৯৯৫ সালের নভেম্বরে তিনি উপ-পরিচালক হিসেবে সেখান থেকে সম্মানের সাথে অবসর গ্রহণ করেন। কিন্তু সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে ব্যস্ত সময় পার করলেও তাঁর মন পড়ে থাকত নিজ জন্মভূমিতে, যেখানকার অজস্র শিশু শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছিল।
একটি আলোর মিনার: বিষ্ণুপুর উচ্চবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা:
মাত্র ২৫ বছর বয়সে, যখন একজন যুবকের নিজের ভবিষ্যৎ ও ক্যারিয়ার গড়ার কথা, ঠিক তখনই আব্দুর রাজ্জাক সাহেব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন নিজ গ্রামকে শিক্ষিত করার এক মহান দায়িত্ব। ১৯৬১ সালের মে মাসে গ্রামের সর্বসাধারণকে একত্রিত করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ার ঐতিহাসিক উদ্যোগ নেন। কঠোর পরিশ্রম ও তহবিল সংগ্রহের মাধ্যমে ১৯৬৩ সালের জানুয়ারিতে প্রতিষ্ঠিত হয় স্বপ্নের প্রথম স্কুল ঘরটি, শুরু হয় ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান।
একটি চারাগাছ যেমন ধীরে ধীরে মহীরুহে পরিণত হয়, রাজ্জাক সাহেবের অবিরাম মেধা ও শ্রমে তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানটিও ঠিক সেভাবেই বিকশিত হয়েছে:
☞১৯৭০ সাল: জুনিয়র হাই স্কুলে উন্নীতকরণ (৬ষ্ঠ শ্রেণি চালু)।
☞১৯৭২ সাল: স্বাধীন বাংলাদেশে ৯ম শ্রেণি চালুর মাধ্যমে হাই স্কুলের পূর্ণাঙ্গ যাত্রা।
☞১৯৭৩ সাল: সরকারি অনুমোদন লাভ এবং প্রাইমারি অংশটিকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় হিসেবে আলাদা রূপ দান।
☞১৯৭৫ সাল: প্রথমবারের মতো স্কুলের শিক্ষার্থীরা সরাসরি নিজ প্রতিষ্ঠানের নামে এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে।
আজ সেই বিষ্ণুপুর উচ্চবিদ্যালয় কুমিল্লা জেলার বাঙ্গরা উপজেলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও শিক্ষাদীক্ষার প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
দ্বীনি শিক্ষার বিস্তার ও সামাজিক অবদান:
সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি দ্বীনি শিক্ষার প্রসারেও তাঁর অবদান ছিল অনস্বীকার্য। ১৯৮৫ সালে তিনি একটি এবতেদায়ী মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। সাময়িক ঝঞ্ঝাটে তা বন্ধ হলেও শিক্ষা বিস্তারে তাঁর স্বপ্ন থেমে থাকেনি। ২০১৯ সালে তা ‘রাহমানিয়া দ্বীনিয়া মাদ্রাসা’ নামে পুনরুজ্জীবিত হয়। আজ এটি দুটি শক্তিশালী উইং ‘বিষ্ণুপুর স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদ্রাসা’ এবং ‘বিষ্ণুপুর রাহমানিয়া হাফেজিয়া মাদ্রাসা’ হিসেবে শিক্ষার্থীদের নৈতিক ও দ্বীনি আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে।
জীবনবোধ ও শেষ বিদায়
ব্যক্তিগত জীবনে আলহাজ্ব আব্দুর রাজ্জাক সাহেব ছিলেন এক অত্যন্ত বিনয়ী, নিরহংকারী ও পরহেজগার মানুষ। সারাজীবন মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন, অর্জন করেছেন হাজারো মানুষের অপরিসীম শ্রদ্ধা।
মৃত্যুর দিন বিকেলে তাঁর বর্তমান বাসস্থান ঢাকার মুগদাপাড়ায় প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরদিন ৭ অক্টোবর নিজ হাত দিয়ে গড়ে তোলা বিষ্ণুপুর উচ্চবিদ্যালয় প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় জানাজা। হাজারো মানুষের চোখের জলে, তাঁরই প্রতিষ্ঠিত স্কুলের পাশ ঘেঁষে গড়ে ওঠা পারিবারিক গোরস্থানে তাঁকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।
আলহাজ্ব আব্দুর রাজ্জাক সাহেব আজ আমাদের মাঝে শারীরিক অনুপস্থিত হলেও তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিদ্যাপীঠ, তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শ এবং হাজার হাজার আলোকিত মানুষের মাঝে তিনি চিরকাল অমর হয়ে থাকবেন। মহান আল্লাহ তাআলা এই মহৎ প্রাণকে জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করুন এবং তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবার ও গুণগ্রাহীদের ধৈর্য ধারণ করার তৌফিক দান করুন।
আমিন!


Leave a Reply