বান্দরবানের লামা উপজেলার দুইবারের উপজেলা চেয়ারম্যান, সরকারি মাতামুহুরী কলেজের প্রতিষ্ঠাতা, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও ‘আধুনিক লামার রূপকার’ হিসেবে খ্যাত আলহাজ্ব মোঃ আলী মিয়ার ১৬তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ শনিবার (২২ আগস্ট)। ২০১০ সালের এই দিনে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন।
দীর্ঘ কর্মময় জীবনে আলহাজ্ব মোঃ আলী মিয়া লামার শিক্ষা, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য ও সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। দুর্গম পাহাড়ি জনপদ লামাকে একটি আধুনিক ও উন্নত জনপদ হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান আজও স্থানীয় মানুষের কাছে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয়।
আলহাজ্ব মোঃ আলী মিয়া ১৯২৩ সালের ১ জানুয়ারি নোয়াখালী জেলার রামগঞ্জ উপজেলার দেবনগর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত খন্দকার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬২ সালের শেষদিকে তৎকালীন রামগড় মহকুমা প্রশাসকের উদ্যোগে তাঁর নেতৃত্বে প্রায় ২০০ পরিবারকে বান্দরবানের লামা উপজেলার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নে বসতি স্থাপনের জন্য পাঠানো হয়। পরবর্তীতে লামার মানুষের সঙ্গে তাঁর নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং তিনি এ জনপদের উন্নয়নে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন।
জনপ্রতিনিধি হিসেবেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত সক্রিয়। ১৯৭৩-৭৪ সালে অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তিনি বৃহত্তর লামা ইউনিয়ন পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। পরে ১৯৭৭ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে লামা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে জনসেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
লামার যোগাযোগ ও অবকাঠামো উন্নয়নেও তাঁর অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। তাঁর উদ্যোগ ও প্রচেষ্টায় ১৯৭৬ সালে লামা-ফাঁসিয়াখালী সড়ক নির্মাণ, ১৯৭৯ সালে লামা থানাকে মহকুমায় রূপান্তর এবং আশির দশকে লামায় বিদ্যুতায়নের ক্ষেত্রে অগ্রগতি সাধিত হয়।
১৯৮৫ সালে তিনি লামা উপজেলার প্রথম উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে দ্বিতীয় মেয়াদেও তিনি উপজেলা চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর দায়িত্বকালীন সময়ে লামা উপজেলায় অসংখ্য স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, পাঞ্জেগানা মসজিদসহ বিভিন্ন শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোর জন্য তিনি নিজেই জমি দান করেন।
শুধু শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নয়, দুর্গম পাহাড়ি এলাকার মানুষের যোগাযোগব্যবস্থা সহজতর করতে রাস্তা, সেতু, কালভার্ট, ক্লিনিকসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণেও তাঁর অবদান ছিল স্মরণীয়। তাঁর উদ্যোগে লামার প্রত্যন্ত অঞ্চলে উন্নয়নের যে ভিত্তি রচিত হয়েছিল, পরবর্তীতে তার ওপর দাঁড়িয়েই এ অঞ্চলের যোগাযোগ ও সামাজিক অবকাঠামোর বিস্তার ঘটে।
মানুষের কল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ এই জনপ্রতিনিধি জীবদ্দশায় মানবতার সেবক হিসেবেও ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। দল-মত ও শ্রেণি-পেশার ঊর্ধ্বে উঠে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কারণে তিনি স্থানীয় জনগণের কাছে ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয়। লামার শিক্ষা, যোগাযোগ ও আর্থসামাজিক উন্নয়নে তাঁর দীর্ঘ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ স্থানীয়ভাবে তিনি ‘আধুনিক লামার রূপকার’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
২০১০ সালের ২২ আগস্ট চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর কর্মময় জীবনের অবসান ঘটে। মৃত্যুকালে তিনি চার স্ত্রী, ১০ ছেলে, ১১ মেয়ে এবং অসংখ্য আত্মীয়স্বজন ও গুণগ্রাহী রেখে যান।
মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে শনিবার সকালে তাঁর কবর জিয়ারত এবং বাদে এশা মোঃ তৈয়ব আলীর বাসভবনে মিলাদ মাহফিল ও দোয়া অনুষ্ঠিত হবে। পরিবারের পক্ষ থেকে আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব ও গুণগ্রাহীদের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ এবং মরহুমের রূহের মাগফিরাত কামনায় দোয়া করার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে।
কালের পরিক্রমায় লামার দৃশ্যপট বদলালেও আলহাজ্ব মোঃ আলী মিয়ার অবদান আজও অম্লান। তাঁর হাতে গড়ে ওঠা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের মধ্যেই যেন বেঁচে আছে তাঁর কর্মময় জীবনের স্মৃতি। মৃত্যুবার্ষিকীতে লামাবাসী গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করছে এই বরেণ্য জনসেবককে।


Leave a Reply