কক্সবাজারের রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে তিন স্বজনকে হারিয়ে নির্বাক জিয়াদুল কবির ও কাজল রেখা
‘আমাদের আর কেউ রইল না, কী নিয়ে বেঁচে থাকব আমরা?’—কথাগুলো বলতে বলতে নির্বাক হয়ে যান মো. জিয়াদুল কবির। চোখের সামনে ভেসে ওঠে একমাত্র ছেলে, একমাত্র মেয়ে ও আদরের নাতির মুখ। কিন্তু তাঁরা কেউ আর বেঁচে নেই। কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানী মেরিন ড্রাইভের পাটুয়ারটেক সমুদ্রসৈকত এলাকার টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে একে একে নিভে গেছে তাঁর পরিবারের তিনটি প্রাণ। স্বজন হারানোর শোকে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন জিয়াদুল কবির ও তাঁর স্ত্রী কাজল রেখা।
জিয়াদুল কবির বরগুনার আমতলী উপজেলার কুকুয়া ইউনিয়নের কালিপুরা গ্রামের বাসিন্দা। তিনি সদ্য অবসরপ্রাপ্ত যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা। জীবনের এই পর্যায়ে এসে একমাত্র ছেলে নাসির সিয়াম (২৬), একমাত্র মেয়ে ফারিহা কবির (৩২) ও নাতি ফাইজান নূরকে (৬) হারিয়ে দিশাহারা এই দম্পতি।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, পূজার ছুটিতে বৃহস্পতিবার দুপুরে জিয়াদুল কবিরের মেয়ে ফারিহা কবির, ছেলে নাসির সিয়াম, নাতি ফাইজান নূর এবং দুই ভায়রার পরিবারের সদস্যরা মিলে মোট ১০ জন কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানী মেরিন ড্রাইভের পাটুয়ারটেক সমুদ্রসৈকত এলাকার টুপটুপ রিসোর্টে ওঠেন। চুয়াডাঙ্গা থেকে তাঁরা সেখানে বেড়াতে যান। কিন্তু আনন্দের সেই ভ্রমণ মুহূর্তেই পরিণত হয় ভয়াবহ ট্র্যাজেডিতে।
রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় জিয়াদুল কবিরের ছেলে, মেয়ে ও নাতিসহ পরিবারের একাধিক সদস্য প্রাণ হারান। এ ঘটনায় তাঁর দুই ভায়রার পরিবারের আরও তিন তরুণ-তরুণীর মৃত্যু হয়েছে। একটি অগ্নিকাণ্ডে ছয়টি প্রাণ ঝরে যাওয়ায় পরিবারগুলোতে নেমে এসেছে শোকের মাতম।
নাসির সিয়াম আমতলীর একটি বেসরকারি বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং ঢাকার সেন্ট যোসেফ কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চীনা ভাষা শিক্ষা বিষয়ে স্নাতক শেষ করে একই বিষয়ে স্নাতকোত্তরের শেষ বর্ষে পড়ছিলেন তিনি। বোন ও ভগ্নিপতির সঙ্গে বৃহস্পতিবার ঢাকা থেকে কক্সবাজারে বেড়াতে গিয়েছিলেন নাসির।
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কক্সবাজারে গেলেও জরুরি কাজ থাকায় শুক্রবার সকালে স্ত্রী ফারিহা, ছেলে ফাইজান ও শ্যালক নাসিরকে সেখানে রেখে চুয়াডাঙ্গায় ফিরে যান নূর আলম। এতে প্রাণে বেঁচে গেলেও স্ত্রী, সন্তান ও শ্যালককে হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েছেন তিনি।
অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন জিয়াদুল কবিরের দুই ভায়রার পরিবারের তিন সদস্যও। তাঁদের মধ্যে মালিহা (২৮) এ বছর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। নাভিলা এ বছর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়ন বিষয়ে স্নাতকোত্তর শেষ করেন। তাঁরা ঢাকার বনশ্রীর তিতাস রোডের বাসিন্দা মুনসুর রশীদের মেয়ে। অপর নিহত আলভী (২৬) আরেক ভায়রা সেলিম মিয়ার মেয়ে। তিনি ঢাকার নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন।
ছেলে, মেয়ে, নাতি ও স্বজনদের মৃত্যুর খবর পেয়ে শনিবার দুপুর ১২টার দিকে স্ত্রী কাজল রেখাকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন জিয়াদুল কবির। মুঠোফোনে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “আমার একমাত্র ছেলে নাসির সিয়াম, একমাত্র মেয়ে ফারিহা কবির ও নাতি ফাইজান উখিয়ার টুপটুপ রিসোর্টের অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছে। আমার এখন বেঁচে থেকে লাভ কী? কী নিয়ে বাঁচব আমি? সব তো শেষ হয়ে গেছে।”
স্ত্রী কাজল রেখা বলেন, “আমার ছেলে, মেয়ে, নাতি—সব শেষ হয়ে গেছে। আমরা আর দুনিয়ায় বেঁচে থেকে কী করব? আল্লাহ, আমাদেরও এখন নিয়ে যাও।”
মেয়ে, নাতি ও শ্যালককে হারিয়ে শোকাহত নূর আলমও কান্নায় ভেঙে পড়েন। প্রিয়জনদের হারানোর যন্ত্রণায় তিনি বলেন, স্ত্রী, ছেলে ও শ্যালককে হারিয়ে তাঁর পৃথিবীটাই যেন শূন্য হয়ে গেছে। যাঁদের নিয়ে বেঁচে থাকার কথা ছিল, তাঁদের ছাড়া বেঁচে থাকাটাই এখন তাঁর কাছে অসহনীয়।
এদিকে মেয়ে মালিহা ও নাভিলাকে হারিয়ে তাঁদের বাবা মুনসুর রশিদ ও মা রোকসানা আক্তার রীনা বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। সন্তান হারানোর শোকে তাঁরা যেন বাকরুদ্ধ। অন্যদিকে মেয়ে আলভীকে হারিয়ে তাঁর বাবা সেলিম ও মা নূর নাহারের বুকফাটা আর্তনাদ থামছেই না। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে শোকাতুর পরিবারগুলোর পরিবেশ।
একটি অগ্নিকাণ্ডে ছয়টি প্রাণ হারানোর এই ঘটনা কয়েকটি পরিবারকে এক মুহূর্তে নিঃস্ব করে দিয়েছে। যে ঘরে সন্তানদের হাসি-আনন্দে মুখর থাকার কথা, সেখানে এখন শুধুই কান্না, হাহাকার আর প্রিয়জনদের ফিরে পাওয়ার অসম্ভব আকুতি।


Leave a Reply