রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:১৪ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায় শুরু হচ্ছে তিন দিনব্যাপী লালন স্মরণোৎসব আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে keynote speaker হিসেবে  পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট এফেয়ার্স এর পরিচালককে আমন্ত্রণ মেরিন ড্রাইভে রেস্টুরেন্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, ৫ পর্যটকের মৃত্যুর খবর, নিখোঁজ আরও অনেকে সুন্দরবন উপকূলীয় এলাকায় জলবায়ুর প্রভাবে জীবন জীবিকা সংকটে লাখাইয়ে প্রথমবারের মতো আমেরিকান ফেস্টিভ্যাল জাতের স্ট্রবেরি চাষের শুভ সূচনা রামগড়ে মন্দির ও বৌদ্ধ বিহারে অনুদান ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারে শিশু ও গো-খাদ্য বিতরণ করলেন এমপি ওয়াদুদ ভূইয়া কুলিয়ারচরে ডেঙ্গু প্রতিরোধে পৌরসভার পরিচ্ছন্নতা অভিযান, জনসচেতনতায় গুরুত্ব কুমিল্লায় যুবদল নেতা কাউছার হত্যার রহস্য উদঘাটন, ২ আসামি গ্রেফতার আমতলীর কবিরের পরিবারে শোকের মাতম, আগুনে গেল ছেলে-মেয়ে-নাতি বান্দরবানে আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভা: পূজা ও পর্যটনে সর্বোচ্চ নিরাপত্তার ঘোষণা

সুন্দরবন উপকূলীয় এলাকায় জলবায়ুর প্রভাবে জীবন জীবিকা সংকটে

কামরুল ইসলাম টিটু বাগেরহাট শরনখোলা প্রতিনিধি
  • Update Time : শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৩৭ সময় দেখুন
৪২

পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের প্রধান বৃক্ষ সুন্দরী গাছ এখন নতুন এক সংকটের মুখে। আগামরা রোগের পাশাপাশি সুন্দরী গাছে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে পরজীবী উদ্ভিদ পরগাছা। আগে গাছের শাখা-প্রশাখায় সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন এর বিস্তার দেখা যাচ্ছে গাছের মূল অংশেও। পরগাছার আক্রমণে দুর্বল হয়ে পড়ছে সুন্দরী গাছ। একপর্যায়ে শুকিয়ে মারা যাচ্ছে অনেক গাছ। গত কয়েক বছরে এই পরজীবীর বিস্তার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় সুন্দরবনের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বন বিভাগের কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সুন্দরবনে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, মিষ্টি পানির প্রবাহ কমে যাওয়া এবং নদ-নদী ভরাটের মতো সংকটের পাশাপাশি পরগাছার বিস্তার সুন্দরী গাছের অস্তিত্বকে আরও ঝুঁকির মুখে ফেলছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় গবেষণা ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে দীর্ঘমেয়াদে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং উপকূলের মানুষের জীবন-জীবিকায় বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।
সুন্দরবনের প্রধান বৃক্ষ সুন্দরী এখন হুমকির মুখে
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত সুন্দরবন শুধু বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনই নয়, ইউনেসকো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যেরও অংশ। বঙ্গোপসাগরের উপকূলজুড়ে বিস্তৃত এই বন প্রাকৃতিক সম্পদের আধার হওয়ার পাশাপাশি ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের আঘাত থেকে উপকূলকে সুরক্ষা দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সুন্দরী গাছের নাম থেকেই সুন্দরবনের নামকরণ হয়েছে বলে প্রচলিত ধারণা রয়েছে।
একসময় বনের বিস্তীর্ণ এলাকায় সুন্দরী গাছের আধিপত্য ছিল। শক্তপোক্ত এই গাছের শিকড় মাটির ক্ষয়রোধে ভূমিকা রাখে। এর শিকড় ও ঝরা পাতা জলজ প্রাণীর আশ্রয় এবং খাদ্যচক্রের অংশ হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। সুন্দরীসহ বিভিন্ন ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদের ওপর বনের অসংখ্য প্রাণীর অস্তিত্ব নির্ভরশীল। ফলে এই বৃক্ষের সংখ্যা কমে গেলে তার প্রভাব পড়তে পারে গোটা বনাঞ্চলের বাস্তুতন্ত্রে।
ভরাট হচ্ছে নদী-খাল, কমছে পানির প্রবাহ
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জের বনাঞ্চলের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত একসময়ের খরস্রোতা ভোলা নদী এখন অনেক জায়গায় ভরাট হয়ে সরু খালে পরিণত হয়েছে। শরণখোলা রেঞ্জের দাসের ভারাণী টহল ফাঁড়ি থেকে চাঁদপাই রেঞ্জের নাংলী টহল ফাঁড়ি, ধানসাগর স্টেশন, জিউধরা স্টেশন ও কলমতেজী টহল ফাঁড়ি হয়ে জয়মনি পর্যন্ত প্রায় ১৬ কিলোমিটার নদী ভরাট হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এ কারণে নদীটি অনেকের কাছে ‘মরা ভোলা’ নামে পরিচিত।
নদী ভরাটের প্রভাবে বনের ভেতরের শাখা খালগুলোতেও পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। এতে সুন্দরীসহ বিভিন্ন ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও টিকে থাকার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন। লবণাক্ততা বৃদ্ধি, পানিপ্রবাহের পরিবর্তন এবং পরগাছার আক্রমণ—সব মিলিয়ে সুন্দরী গাছের সংকট আরও জটিল হয়ে উঠছে।
২৫ থেকে ৩০ শতাংশ সুন্দরী গাছে পরগাছার আক্রমণ
বন বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, সুন্দরবনের শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ সুন্দরী গাছে পরগাছার আক্রমণ দেখা গেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
পরগাছা একধরনের পরজীবী উদ্ভিদ, যা আশ্রয়দাতা গাছের ওপর জন্মে এবং সেখান থেকে পানি ও পুষ্টি গ্রহণ করে। এতে আক্রান্ত গাছ দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। দীর্ঘদিন ধরে আক্রমণ চলতে থাকলে গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, পাতা হলুদ হয়ে ঝরে পড়ে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে গাছ মারা যেতে পারে।
তবে সুন্দরবনে কোন প্রজাতির পরগাছা কীভাবে বিস্তার লাভ করছে, এর আক্রমণের প্রকৃত কারণ কী এবং কীভাবে কার্যকরভাবে এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব—এসব বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
জলবায়ু পরিবর্তনে বাড়ছে বহুমুখী সংকট
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সুন্দরবনে লবণাক্ততা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের মতো দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে। দুর্যোগের সময় লবণাক্ত পানি বনের ভেতরে প্রবেশ করছে। পাশাপাশি নদ-নদী ও খালে পলি জমে পানিপ্রবাহ ব্যাহত হওয়ায় বনের বিভিন্ন অংশে মিষ্টি পানির স্বাভাবিক সরবরাহ কমে যাচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে সুন্দরী গাছের আগামরা রোগ বা টপ ডাইংয়ের পাশাপাশি পরগাছা, ছত্রাক ও কীটপতঙ্গের আক্রমণও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এসব সমস্যার মধ্যে কোনটির প্রভাব কতটা, তা নির্ধারণে সমন্বিত গবেষণা প্রয়োজন।

জীববৈচিত্র্য ও খাদ্যশৃঙ্খলে প্রভাবের আশঙ্কা
সুন্দরী গাছের সংখ্যা কমে গেলে বনের জীববৈচিত্র্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। গাছের শিকড় ও আশপাশের জলজ পরিবেশ বিভিন্ন মাছ, চিংড়ি ও অন্যান্য প্রাণীর আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে। গাছের ডালপালায় পাখিরা বাসা বাঁধে। অন্যদিকে, বনের বিভিন্ন উদ্ভিদ ও আবাসস্থল বানর, হরিণসহ নানা বন্যপ্রাণীর জীবনধারণে ভূমিকা রাখে।

সুন্দরবনের খাদ্যশৃঙ্খল ও বাস্তুতন্ত্র পরস্পরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। ফলে সুন্দরী গাছের আবাসস্থল কমে গেলে তার প্রভাব অন্য উদ্ভিদ ও প্রাণীর ওপরও পড়তে পারে। তবে এই পরিবর্তনের ব্যাপ্তি ও মাত্রা নিরূপণে দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ জরুরি।

সংকটে পড়তে পারে উপকূলের মানুষের জীবন-জীবিকা
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সুন্দরবনের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা ১০ লাখের বেশি। মাছ ও কাঁকড়া আহরণ, মধু ও মোম সংগ্রহ, গোলপাতাসহ অনুমোদিত বনজ সম্পদ আহরণ এবং পর্যটন ব্যবসার মাধ্যমে বহু মানুষ জীবিকা নির্বাহ করেন।

অনুগ্রহ করে এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৫-২০২৬
ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: Jp Host BD