শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:০৪ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
লাখাইয়ে একাধিক মামলার পরোয়ানাভুক্ত আসামি আব্বাস উদ্দিন গ্রেফতার ট্রাকের চাপায় পিষ্ট ভ্যান চালক বাগেরহাট জেলা প্রশাসকের হল রুমে এনাবেল প্রকল্পের ও সি এস ও নেটওয়ার্কের অবহিতকরণ সভা অনুষ্ঠিত মহাষষ্ঠী শুক্রবার, দুর্গোৎসব ঘিরে উৎসবের সাজে টুঙ্গিপাড়া বুড়িচংয়ে ডাকাতির প্রস্তুতি, দেশীয় অস্ত্রসহ আটক-২ আমতলীতে আন্তর্জাতিক সিসা দূষণ প্রতিরোধ সপ্তাহ উপলক্ষে সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে বান্দরবান সেনা জোনের আর্থিক অনুদান প্রদান রামগড়ে হারানো মেয়েকে ৯ বছর পর ফিরে পেলেন মা লাখাইয়ে ৩০ বছর ধরে মেলেনি বিধবা ভাতা, কষ্টে কাটছে বৃদ্ধা পণ্ডিত বিবির জীবন শায়েস্তাগঞ্জে ট্রাকের ধাক্কায় মোটরসাইকেল আরোহী নিহত

আমতলীতে আন্তর্জাতিক সিসা দূষণ প্রতিরোধ সপ্তাহ উপলক্ষে সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান

মাইনুল ইসলাম রাজুআমতলী (বরগুনা) প্রতিনিধি:
  • Update Time : বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬
  • ২৩ সময় দেখুন
২৮

আন্তর্জাতিক সিসা দূষণ প্রতিরোধ সপ্তাহ উপলক্ষে বরগুনার আমতলী উপজেলার উদয়ের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সিসা দূষণের ক্ষতিকর প্রভাব ও প্রতিরোধবিষয়ক সচেতনতামূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইসিডিডিআর,বি-এর দেশব্যাপী জনসচেতনতামূলক কর্মসূচির অংশ হিসেবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আমতলী উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মনজুরুল আহম্মেদ কাওসার, আমতলীর সিনিয়র সাংবাদিক হায়াতুজ্জামান মিরাজ মৃধা এবং স্বপ্নছোঁয়া স্বেচ্ছাসেবী যুব সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মোঃ রিয়াজুল ইসলাম।

অনুষ্ঠানে সিসা দূষণের ক্ষতিকর প্রভাব, এর উৎস, মানবদেহে সিসা প্রবেশের উপায় এবং শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় করণীয় বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়।

সিসা মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর

সিসা একটি বিষাক্ত ভারী ধাতু। মানবদেহে সিসার কোনো উপকারী বা প্রয়োজনীয় ভূমিকা নেই; বরং এটি মস্তিষ্ক, কিডনি, রক্তসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের ক্ষতি করতে পারে। সিসার সংস্পর্শের কোনো মাত্রাকেই সম্পূর্ণ নিরাপদ বলা যায় না। বিশেষ করে শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ, বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা ও আচরণের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

সাধারণত সিসাযুক্ত ধুলা বা ধোঁয়া শ্বাসের সঙ্গে এবং দূষিত খাবার, পানি ও ধুলাবালুর মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করে। শিশুদের হাত বা খেলনায় সিসাযুক্ত ধুলা লেগে থাকলে সেগুলো মুখে দেওয়ার মাধ্যমে শরীরে সিসা প্রবেশ করতে পারে। শরীরে প্রবেশের পর সিসা রক্তের মাধ্যমে বিভিন্ন অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে এবং রক্ত, হাড় ও দাঁতে দীর্ঘদিন জমা থাকতে পারে। গর্ভাবস্থায় মায়ের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে জমে থাকা সিসা পুনরায় রক্তে প্রবেশ করে গর্ভস্থ শিশুর শরীরেও পৌঁছাতে পারে, যা শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।

সিসার বিষক্রিয়ায় সব সময় দৃশ্যমান লক্ষণ দেখা যায় না। তবে উপসর্গ দেখা দিলে পেটব্যথা, কোষ্ঠকাঠিন্য, মাথাব্যথা ও দুর্বলতা হতে পারে। তীব্র বিষক্রিয়ায় খিঁচুনি কিংবা অচেতনতার মতো গুরুতর পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে। সিসার সংস্পর্শে আসার আশঙ্কা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শে রক্তে সিসার মাত্রা পরীক্ষা বা ব্লাড লিড লেভেল (BLL) নির্ণয় করা হয়।

দেশের শিশুদের রক্তে সিসার উদ্বেগজনক উপস্থিতি

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০২৫-এর প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী, দেশে ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের ৩৮ দশমিক ৪ শতাংশের রক্তে সিসার মাত্রা প্রতি ডেসিলিটারে ৩ দশমিক ৫ মাইক্রোগ্রাম বা তার বেশি। অর্থাৎ, এই বয়সী শিশুদের প্রায় প্রতি পাঁচজনের দুজনের রক্তে সিসার মাত্রা উল্লিখিত সীমার সমান বা তার বেশি পাওয়া গেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, রক্তে সিসার কোনো নিরাপদ মাত্রা নেই। অল্প পরিমাণ সিসার সংস্পর্শও শিশুদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ও আচরণে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণে শিশুদের সিসা দূষণের ঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, উৎপাদক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সম্মিলিত উদ্যোগ জরুরি।

ভেজাল হলুদে সিসা দূষণের উৎস শনাক্ত

বাংলাদেশে সিসা দূষণের উৎস অনুসন্ধানে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা হয় গর্ভবতী নারীদের রক্ত পরীক্ষার ফলাফল থেকে। তাঁদের শরীরে সিসা কোথা থেকে আসছে, তা অনুসন্ধান করতে আইসিডিডিআর,বি ও সহযোগী প্রতিষ্ঠানের গবেষকেরা খাবার এবং আশপাশের পরিবেশের বিভিন্ন উপকরণ পরীক্ষা করেন।

সম্ভাব্য উৎস হিসেবে হলুদ, সিসা দিয়ে রাঙানো কৌটা এবং খাবারের জন্য ব্যবহৃত কিছু মাটি ও কাদামাটিজাতীয় উপকরণ পরীক্ষা করা হয়। পরবর্তী সময়ে সিসার আইসোটোপ বিশ্লেষণের মাধ্যমে গবেষণায় অংশ নেওয়া নারীদের রক্তে থাকা সিসার সঙ্গে ভেজাল হলুদের যোগসূত্র শনাক্ত করতে সহায়তা পাওয়া যায়।

গবেষণা দলের উপস্থাপনা অনুযায়ী, ২০১৭–১৮ সালে নয়টি জেলার বাজার থেকে সংগ্রহ করা হলুদের নমুনা পরীক্ষা করে সাতটি জেলায় সিসা দূষণের প্রমাণ পাওয়া যায়। কোনো কোনো নমুনায় সিসার পরিমাণ ছিল জাতীয় সীমার সর্বোচ্চ ৫০০ গুণ। হলুদকে আরও উজ্জ্বল দেখানোর জন্য ব্যবহৃত সিসাযুক্ত লেড ক্রোমেট মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য বিষাক্ত উপাদান হিসেবে চিহ্নিত হয়।

গবেষণার তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে বাজারপর্যায়ে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়। হলুদের ব্যবসায়ী ও প্রক্রিয়াজাতকারীদের সচেতন করা, গণমাধ্যমে বিষয়টি তুলে ধরা এবং বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের নজরদারি ও আইন প্রয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরবর্তী পর্যবেক্ষণে হলুদে সিসা দূষণ কমার তথ্য পাওয়া যায়।

গবেষকদের এই অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, দূষণের উৎস সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া গেলে এবং সেই প্রমাণের ভিত্তিতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হলে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।

ঢাকার শিশুদের রক্তেও সিসার উপস্থিতি

ঢাকার দুই থেকে চার বছর বয়সী ৫০০ শিশুকে নিয়ে পরিচালিত একটি গবেষণার ফলাফলও সিসা দূষণ নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। গবেষণায় অংশ নেওয়া প্রত্যেক শিশুর রক্তে শনাক্তযোগ্য সিসা পাওয়া যায়। তাদের প্রায় ৮০ শতাংশের রক্তে সিসার মাত্রা ছিল প্রতি ডেসিলিটারে ৫ মাইক্রোগ্রাম বা তার বেশি।

গবেষণাটির ফলাফল ঢাকার সব শিশুর পরিস্থিতির প্রতিনিধিত্ব করে না। তবে এতে অন্তর্ভুক্ত শিশুদের অবস্থা নগরাঞ্চলের দূষণের উৎসগুলো আরও গভীরভাবে অনুসন্ধানের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।

গবেষণায় ব্যাটারি তৈরি ও পুনর্ব্যবহারসহ সিসাসমৃদ্ধ শিল্পবর্জ্য, রঙের গুঁড়া এবং দূষিত গৃহস্থালি পণ্যের সঙ্গে রক্তে সিসার মাত্রার সম্পর্কের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। ব্যবহৃত সিসাযুক্ত ব্যাটারি অনিরাপদভাবে ভাঙা ও সিসা গলানোর ফলে দূষণ শুধু কারখানার ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকে না; আশপাশের মাটি, বাতাস ও পরিবেশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। দূষিত মাটিতে খেলাধুলা করা শিশুরা এতে স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ে, অথচ দূষণের উৎস নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা তাদের পরিবারের হাতে সব সময় থাকে না।

সিসা দূষণ প্রতিরোধে করণীয়

সিসার সংস্পর্শ কমাতে পরিবারের কিছু সচেতন অভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, শিশুদের খেলনা পরিষ্কার রাখা, ভেজা কাপড় দিয়ে ঘরের মেঝে ও আসবাব মোছা এবং শিশুদের দূষিত মাটি ও ধুলাবালু থেকে দূরে রাখার মতো পদক্ষেপ সিসার সংস্পর্শ কমাতে সহায়তা করতে পারে।

তবে বাজারে ব্যবহৃত রং, রান্নার পাত্র কিংবা কারখানার বর্জ্য নিরাপদ কি না, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু পরিবারের পক্ষে পালন করা সম্ভব নয়। এ জন্য পণ্যের মান পরীক্ষা, উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় নিয়ন্ত্রণ, শিল্পবর্জ্যের নিরাপদ ব্যবস্থাপনা এবং সিসাযুক্ত বর্জ্যের নিরাপদ পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিরোধমূলক নির্দেশনাতেও এসব বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ভেজাল হলুদে সিসা দূষণসংক্রান্ত গবেষণা দেখিয়েছে, দূষণের উৎস শনাক্ত করা গেলে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ তৈরি হয়। দূষিত মাটি পরিষ্কার করার অভিজ্ঞতাও প্রমাণ করে, যথাযথ উদ্যোগের মাধ্যমে সিসার সংস্পর্শ কমানো সম্ভব। এখন সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ঘর, বাজার ও কর্মক্ষেত্রে সিসা প্রবেশের পথ বন্ধ করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

শিশুদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার আহ্বান

একটি শিশু যখন ঘরের মেঝেতে বসে খেলাধুলা করে, তখন নিজের পরিবেশকে নিরাপদ করার ক্ষমতা তার থাকে না। তার খেলনা, খাবার, বাসস্থান ও আশপাশের মাটি নিরাপদ রাখার দায়িত্ব অভিভাবক, উৎপাদক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের।

প্রতি বছর আন্তর্জাতিক সিসা দূষণ প্রতিরোধ সপ্তাহ পালনের মাধ্যমে সিসার ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী জনসচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ উপলক্ষে আইসিডিডিআর,বি ‘শনাক্তকরণ থেকে প্রতিরোধে’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন এলাকায় জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এর অংশ হিসেবে দেশের ১৭টি জেলার ২৫টি উপজেলার স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীদের নিয়ে সিসা দূষণবিষয়ক সচেতনতামূলক সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছে। পাশাপাশি জনবহুল এলাকায় তরুণদের সম্পৃক্ত করে লিফলেট ও স্টিকার বিতরণের মাধ্যমে সিসা দূষণ থেকে দূরে থাকার বার্তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।

আমতলীর উদয়ের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে আয়োজিত এ কর্মসূচিও সিসা দূষণ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরার একটি উদ্যোগ। শিশুদের বিকাশে ক্ষতির লক্ষণ দেখা দেওয়ার আগেই সিসার সংস্পর্শ প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। জনসচেতনতা বৃদ্ধি, দূষণের উৎস শনাক্তকরণ এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বশীল ভূমিকার মাধ্যমেই নিরাপদ পরিবেশ ও সুস্থ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা সম্ভব।

অনুগ্রহ করে এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৫-২০২৬
ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: Jp Host BD