মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার ঘোরদৌর বাজারে ‘সওতুল কুরআন হাফিজিয়া কওমি মহিলা মাদ্রাসা ও লিল্লা বোর্ডিং’-এর চারতলা ভবনের ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে লাবনী আক্তার (১৬) নামের এক মাদ্রাসা ছাত্রীর গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনায় একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসছে। প্রাথমিক অবস্থায় ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বা নিছক দুর্ঘটনা মনে করা হলেও, নিবিড় অনুসন্ধানে এটি পরিকল্পিত নাকি প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলার ফল—তা নিয়ে জোরালো প্রশ্ন উঠেছে। ঘটনার নেপথ্যে ছাদের চাবির সহজলভ্যতা, প্রিন্সিপালের মাদকাসক্ত পুত্রের উপস্থিতি গোপন করার অপচেষ্টা এবং প্রতিষ্ঠানপ্রধানের বিতর্কিত অতীত সামনে চলে এসেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার পরপরই মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে নিজের ও মাদকাসক্ত ছেলের পক্ষে সাফাই গাইতে শুরু করেন। শুরুতে তিনি দাবি করেছিলেন যে, ঘটনার সময় তাঁর ছেলে সেখানে উপস্থিত ছিল না। তবে পরবর্তীতে সাংবাদিকদের কঠোর ও ধারাবাহিক প্রশ্নের মুখে তিনি স্বীকার করতে বাধ্য হন যে, ঘটনার সময় তাঁর ছেলে সেখানে উপস্থিত ছিল। এছাড়া একজন নারী আবাসিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে তাঁর কুরুচিপূর্ণ আচরণ, কথাবার্তা ও দায়িত্বজ্ঞানহীন অঙ্গভঙ্গি নিয়ে স্থানীয় সচেতন মহলে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
অরক্ষিত ছাদের চাবি ও প্রাতিষ্ঠানিক গাফিলতি:
একটি আবাসিক মহিলা মাদ্রাসার ছাদের তালাবদ্ধ গেটের চাবি কীভাবে ২৪ ঘণ্টা বাবুর্চিখানার এক কোণে অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিভাবকরা। প্রিন্সিপাল নিজেই স্বীকার করেছেন যে, চাবিটি খোলা জায়গায় রাখা থাকত এবং সেখান থেকেই লাবনী চাবি নিয়ে ছাদে যায়। ন্যূনতম কোনো নিরাপত্তা বা তদারকি ব্যবস্থা ছাড়া ছাত্রীদের হোস্টেলে এমন উন্মুক্ত পরিস্থিতি প্রাতিষ্ঠানিক চরম অবহেলা ও প্রশাসনিক গাফিলতির প্রমাণ বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
দায় এড়াতে ভিন্নখাতে প্রবাহের অপচেষ্টা:
ঘটনার দায় নিজের কাঁধ থেকে সরাতে প্রিন্সিপাল পাশের বাড়ির মালিক মো. রাকিব ও দারোয়ান পরিবারকে জড়িয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে ভিন্ন চিত্র। পাশের বাড়ির মালিক মো. রাকিব জানান, দারোয়ানের ছেলের সাথে মেয়েটির সম্পর্কের বিষয়টি পূর্বেই উভয় পরিবারের অভিভাবক ও স্থানীয়দের উপস্থিতিতে সৌহার্দ্যপূর্ণভাবে নির্ধারিত ছিল। মেয়েটির পড়াশোনা শেষ হলে আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের বিয়ের কথাবার্তা হওয়ার কথা ছিল, ফলে সেখান থেকে কোনো জটিলতা তৈরির সুযোগ ছিল না। তাঁর মতে, তদন্তের দিক অন্যদিকে মোড় ঘোরাতে ও নিজেকে বাঁচাতে প্রিন্সিপাল এই ইস্যুটিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছেন। এমনকি ভুক্তভোগী পরিবারকে আর্থিক সহায়তার লোভ দেখিয়ে বিষয়টি আপস করারও চেষ্টা চলছে বলে জানা গেছে।
প্রিন্সিপালের বিতর্কিত অতীত:
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, অভিযুক্ত প্রিন্সিপালের অতীত রেকর্ডও চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। এর আগে অন্য এক ছাত্রীর সাথে প্রিন্সিপালের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সালিশের কারণে প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন বন্ধ রাখা হয়েছিল। পরবর্তীতে নানামুখী প্রভাবে এটি পুনরায় চালু করা হয়। এর আগেও কনকশার এলাকায় দায়িত্ব পালনকালে তাঁর বিরুদ্ধে অনৈতিক আচরণের অভিযোগ উঠেছিল। অতীতের এসব কর্মকাণ্ড ও অলৌকিক দাবির বিষয়ে সাংবাদিকদের সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি।
বর্তমানে গুরুতর আহত লাবনী আক্তার ঢাকার জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (পঙ্গু হাসপাতাল) আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
স্থানীয়দের দাবি:
এই হৃদয়বিদারক ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার দাবিতে স্থানীয় সচেতন মহল ও অভিভাবকসমাজ প্রশাসনের কাছে ৩টি সুনির্দিষ্ট দাবি জানিয়েছেন—
আইনি ও দাপ্তরিক বৈধতা যাচাই: প্রতিষ্ঠানটির আদৌ কোনো সরকারি বা প্রশাসনিক বৈধ কাগজপত্র ও শিক্ষা পরিচালনার ছাড়পত্র রয়েছে কি না, তা অবিলম্বে খতিয়ে দেখতে হবে।
উপজেলা প্রশাসনের নিবিড় তদন্ত: বিতর্কিত ও অনৈতিক রেকর্ডের অধিকারী একজন ব্যক্তি কীভাবে একটি আবাসিক মহিলা মাদ্রাসা পরিচালনার দায়িত্বে বহাল থাকেন—উপজেলা প্রশাসনকে তার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
নিরপেক্ষ বিচার: তদন্ত প্রক্রিয়াকে ধীরগতি করতে বা ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে যে চক্রটি তৎপর রয়েছে, তাদের আইনের আওতায় এনে প্রকৃত সত্য উদঘাটন ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।


Leave a Reply