বান্দরবান, ৯ আগস্ট ২০২৬:
পাহাড় ও সমতলে বসবাসরত জনগোষ্ঠীর ‘আদিবাসী’ পরিচয়ের সাংবিধানিক স্বীকৃতি চাওয়া হয়েছে নিজেদের অধিকার, পরিচয় ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য; কোনোভাবেই বিচ্ছিন্নতাবাদী হওয়ার উদ্দেশ্যে নয় বলে মন্তব্য করেছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য কেএস মং।
রোববার (৯ আগস্ট) সকালে বান্দরবানের ঐতিহ্যবাহী রাজার মাঠে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
কেএস মং বলেন, পাহাড়ের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি ও প্রত্যাশার সঙ্গে সাংবিধানিক স্বীকৃতির বিষয়টি গভীরভাবে জড়িত। নিজেদের অস্তিত্ব, অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্যই এ স্বীকৃতির দাবি জানানো হয়েছে। তবে দাবি বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি থাকায় পার্বত্য চট্টগ্রামে নানা সংকট এখনো বিদ্যমান।
তিনি অভিযোগ করেন, পাহাড়ের মানুষ সাংবিধানিক অধিকার ও স্বীকৃতির দাবি জানালেই কিছু সংগঠন এর বিরোধিতা করে এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীকে সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করে অপপ্রচার চালানো হয়। এসব অপপ্রচার ও বিভ্রান্তি থেকে বেরিয়ে এসে বাংলাদেশ ও পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের দাবি
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির প্রসঙ্গে কেএস মং বলেন, চুক্তির অন্যতম লক্ষ্য ছিল পার্বত্য অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর বাস্তবতা ও দেশের সংবিধানকে বিবেচনায় নিয়ে একটি কার্যকর স্বশাসন কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা। পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও পার্বত্য জেলা পরিষদ গঠন সেই কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
তবে চুক্তির তিন দশক পেরিয়ে গেলেও ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের কার্যক্রম এখনো কার্যকরভাবে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, আইনের শাসন তখনই কার্যকর হবে, যখন ভূমি কমিশনকে বিশেষ মহলের প্রভাব ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থেকে মুক্ত করে কার্যকর করা হবে। পাশাপাশি আদিবাসীদের সম্মিলিত ও প্রথাগত ভূমির মালিকানাকে আইনি সুরক্ষার আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় গুরুত্বারোপ
পাহাড়ের উন্নয়ন প্রসঙ্গে কেএস মং বলেন, পাহাড়, বন ও পাথরসহ প্রাকৃতিক সম্পদের অতিরিক্ত আহরণ এবং বন ধ্বংস করে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হলে এর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি বহন করতে হবে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকেই।
তিনি বলেন, পাহাড়ের মানুষ প্রকৃতিকে শাসন করে না; বরং প্রকৃতির সঙ্গে সমন্বয় করে জীবনযাপন করে। প্রকৃতি থেকে কতটুকু সম্পদ গ্রহণ করতে হবে এবং কীভাবে তা সংরক্ষণ করতে হবে—এ বিষয়ে পাহাড়ের জনগোষ্ঠীর রয়েছে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যগত জ্ঞান।
ভূমি ও অধিকার সুরক্ষার দাবি
আলোচনা সভায় বক্তারা আদিবাসীদের ভূমির অধিকার, আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, রাজনৈতিক অধিকার, মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার দাবি জানান। একই সঙ্গে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং নিজস্ব মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
আদিবাসীদের প্রতি সব ধরনের বৈষম্য ও বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে সমঅধিকার নিশ্চিত করারও আহ্বান জানান বক্তারা।
বর্ণাঢ্য র্যালি
আলোচনা সভায় আদিবাসী ফোরামের সভাপতি ডা. মং উষাথোয়াই সভাপতিত্ব করেন। অনুষ্ঠানের উদ্বোধক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান থোয়াইং চ প্রু মাস্টার।
পার্বত্য চট্টগ্রাম রাইটার্স ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ক্যসামং মারমা-এর সঞ্চালনায় সভায় বক্তব্য দেন মেন রুং ম্রো, আদিবাসী ফোরামের সহ-সাধারণ সম্পাদক কৃপা ত্রিপুরা, রিপন চক্রবর্তী, জিরকুম সাহু ও উছোমং মারমা।
আলোচনা সভা শেষে রাজার মাঠ থেকে একটি বর্ণাঢ্য র্যালি বের করা হয়। র্যালিটি বান্দরবান শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় রাজার মাঠে গিয়ে শেষ হয়।
র্যালিতে মারমা, চাকমা, ত্রিপুরা, ম্রো, তঞ্চঙ্গ্যা, বম, খুমী, লুসাইসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর তরুণ-তরুণী এবং পাহাড়ি বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ অংশ নেন।
আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের এ আয়োজনের মধ্য দিয়ে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর পরিচয়, অধিকার, ভূমি, সংস্কৃতি, ভাষা ও মর্যাদা রক্ষার দাবিগুলো আবারও প্রকাশ্যে উঠে আসে।


Leave a Reply