প্রতিটি রান্নাঘরে এখন এলপি গ্যাস এক অপরিহার্য উপাদান। কিন্তু এই অতিপ্রয়োজনীয় জ্বালানির বাজারদর নিয়ে সাধারণ ভোক্তা এবং খুচরা ব্যবসায়ীদের মধ্যে প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে জটিলতা। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) গ্যাসের দাম নির্ধারণ করে দিলেও, মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ আলাদা। সরকারি মূল্য এবং প্রান্তিক বাজারের প্রকৃত খরচের ফারাকের কারণে চরম বিপাকে পড়েছেন ছোট খুচরা ব্যবসায়ীরা।
সাম্প্রতিক বাজার বিশ্লেषণে দেখা যায়, সরকার ১২ কেজি সাইজের একটি এলপি সিলিন্ডারের খুচরা মূল্য নির্ধারণ করেছে ১৫৯৮ টাকা। কিন্তু পাইকারি ব্যবসায়ীরা ছোট দোকানদারদের কাছে এই সিলিন্ডার বিক্রি করছেন ১৬০০ টাকায়। অর্থাৎ, পাইকারি পর্যায়েই সরকারি মূল্যের চেয়ে বেশি দাম দিতে হচ্ছে খুচরা বিক্রেতাদের।
এরপর যোগ হয় স্থানীয় পরিবহন ও শ্রমের খরচ। ছোট দোকান থেকে গ্রাহকের বাড়িতে একটি গ্যাস সিলিন্ডার পৌঁছে দিতে কুলি বা পরিবহন বাবদ অতিরিক্ত ৫০ থেকে ৭০ টাকা খরচ হয়। এর সঙ্গে রয়েছে দোকানের ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল ও অন্যান্য ব্যবসায়িক আনুষঙ্গিক খরচ। ফলে পাইকারি দাম ১৬০০ টাকা এবং কুলি খরচ ৬০ টাকা যোগ করলে একজন খুচরা বিক্রেতার প্রকৃত ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১৬৬০ থেকে ১৬৯০ টাকায়।
নিয়ম অনুযায়ী ব্যবসা পরিচালনা করতে গেলে খুচরা বিক্রেতাকে যদি সরকারি দাম ১৫৯৮ টাকায় গ্যাস বিক্রি করতে হয়, তবে তাঁকে প্রতি সিলিন্ডারে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ লোকসান গুনতে হবে। পক্ষান্তরে, তাঁরা যদি খরচ বিবেচনা করে দাম রাখেন, তবে তা সরকারি দামের চেয়ে বেশি হওয়ায় নানামুখী প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়।
খুচরা ব্যবসায়ীদের মতে, পাইকারি বাজার থেকে ছোট দোকানে গ্যাস পৌঁছানোর প্রক্রিয়াটিতে কোনো নিয়ন্ত্রণ না থাকায় এই কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে। ডিলার বা পাইকাররা অনেক সময় নির্ধারিত মূল্যে গ্যাস সরবরাহ করেন না। আবার গ্রাহক পর্যায়ে হোম ডেলিভারির ক্ষেত্রে শ্রমিকের মজুরি বা পরিবহন খরচ সরকারি মূল্য তালিকায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ না থাকায় খুচরা বিক্রেতা ও ক্রেতার মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হচ্ছে।
বাজার বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি:
১. ডিলার ও পাইকারি পর্যায়ে নজরদারি: পাইকারি ব্যবসায়ীরা যাতে খুচরা বিক্রেতাদের কাছে অতিরিক্ত মূল্যে গ্যাস বিক্রি করতে না পারেন, সে জন্য ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনের কঠোর তদারকি প্রয়োজন।
২. সেবামূলক চার্জের স্বচ্ছতা: গ্রাহকের বাড়িতে গ্যাস পৌঁছে দেওয়ার জন্য কুলি বা পরিবহন খরচকে (যেমন: ৫০-৭০ টাকা) একটি নির্দিষ্ট ‘ডেলিভারি চার্জ’ হিসেবে আলাদাভাবে বিবেচনা করা যেতে পারে, যা সরাসরি ক্রেতা বহন করবেন।
৩. বাস্তবসম্মত মূল্য নির্ধারণ: প্রান্তিক পর্যায়ের পরিবহন ও পরিচালনা খরচ বিবেচনা করে বিইআরসি নির্ধারিত মূল্যের সাথে বাজার বাস্তবতার একটি সুষম সমন্বয় সাধন করা দরকার।
এলপি গ্যাসের মতো সংবেদনশীল পণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে এবং খুচরা বিক্রেতা ও সাধারণ ক্রেতা—উভয়ের স্বার্থ রক্ষার্থে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে—এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট সকলের।


Leave a Reply