একাধিক গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পরও টনক নড়েনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার গোবরিয়া আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের সরকারি জায়গা থেকে আবারও গাছ কেটে নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। দিনের বেলায় প্রকাশ্যে একের পর এক মূল্যবান সরকারি গাছ চুরি হলেও প্রতিরোধে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় স্থানীয়দের মাঝে চরম ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, এর আগে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক, স্থানীয় পত্রিকা ও অনলাইন নিউজ পোর্টালে গাছ কাটা এবং দুর্নীতির বিষয়ে সংবাদ প্রকাশিত হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কার্যকর কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।প্রশাসনিক নজরদারি ও দৃশ্যমান পদক্ষেপের অভাবে অপরাধীরা বারবার পার পেয়ে যাচ্ছে এবং পুনারায় সরকারি গাছ কেটে লুটপাট করার সাহস পাচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের শুরুতে গোবরিয়া আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের প্রায় ১০০ গজ সামনে গোবরিয়া আব্দুল্লাহপুর মৌজার ১নং খতিয়ানভুক্ত আর.এস ১০৬৬৭ দাগের (শ্রেণি-হালট) সরকারি খাল ও রাস্তার পাশ থেকে প্রায় ২০ থেকে ২৫টি সরকারি গাছ কেটে বিক্রি করার অভিযোগ ওঠে গোবরিয়া আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা নাছিমা আক্তার ও অফিস সহায়ক মো. রুকন উদ্দিনের বিরুদ্ধে। আনুমানিক ১০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার এই ঘটনাটি অভিনব কৌশলে নাটকীয় ভাবে ধামাচাপা দিতে গত ১৫ জানুয়ারি কুলিয়ারচর থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ১৮টি গাছ চুরির একটি লিখিত অভিযোগ দেন নাছিমা আক্তার।
তবে স্থানীয়দের দাবি, থানায় দেওয়া সেই অভিযোগটি কোথাও এন্ট্রি কিংবা এফআইআর হয়নি। এমনকি কোনো তদন্তের মুখও দেখেনি। ওই অভিযোগপত্রে থানার একটি সিল ও রিসিভ লিখা দেখিয়ে জনসাধারণের মুখ বন্ধ রাখার অপচেষ্টা চালানো হয়। এমনকি এর কিছুদিন পর একইভাবে আরও ৩টি গাছ বিক্রি করে প্রায় ৮০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে তাদের বিরুদ্ধে। গাছ কাটার সময় উপজেলা প্রশাসনকে অবহিত করার পর প্রথমে গাছগুলো কাটা বন্ধ করা হলেও এর কয়েকদিনপর অদৃশ্য ক্ষমতার দাপটে গাছগুলো নিয়ে গেলেও রহস্যজনক কারনে কার্যকর কোন পদক্ষেপ নেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
সরকারি জায়গার গাছ বিক্রি করে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেয়াসহ ক্ষমতার অপব্যবহার, কাল্পনিক শ্রেণী পরিবর্তন করে অতিরিক্ত কর আদায়, লাখ লাখ টাকা ঘুষ বাণিজ্য, সরকারি বিধিমালাকে তোয়াক্কা না করে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে হয়রানি ও অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনায় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে “কুলিয়ারচরে ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা নাছিমা আক্তার ও অফিস সহায়ক রুকনের দুর্নীতির পাহাড়” শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে এলাকায় চরম চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। সংবাদ প্রকাশের সাত দিনের মাথায় গত ২৩ জুলাই কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয় (রাজস্ব শাখা) থেকে এক অফিস আদেশে (স্মারক নং: ৩১.১২.৪৮০০.০০৭.১৬.০০১.(অংশ).১২-১২১৫) ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা নাছিমা আক্তারকে তাড়াইল উপজেলার ধলা ইউনিয়ন ভূমি অফিসে বদলি করা হয়। রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর নিলুফা আক্তার রুপা স্বাক্ষরিত আদেশে ২৭ জুলাইয়ের মধ্যে অবমুক্ত হওয়ার নির্দেশ এবং অমান্য করলে তাৎক্ষণিক অবমুক্ত (Stand Release) বলে গণ্য হওয়ার কথা জানানো হয়। এ রিপোর্ট লিখা পর্যন্ত নাছিমা আক্তার তার কর্মস্থল ত্যাগ করেনি। বহাল তরিতে অফিস করে যাচ্ছেন তিনি।
বদলি আদেশ জারির পরদিন ২৪-২৬ জুলাই তড়িঘড়ি করে একই স্থান থেকে আবারও তিনটি মূল্যবান সরকারি গাছ কাটা হয়। স্থানীয়রা গাছ কাটার ভিডিও উপজেলা প্রশাসনসহ ওই ভূমি সহকারী কর্মকর্তা ও অফিস সহায়ক রুকন উদ্দিনের নিকট পাঠান। ভিডিও চিত্রে কারা কারা গাছগুলো কেটে নিয়ে যাচ্ছে তার স্পষ্ট তথ্য-প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও তাদের নামে কোন অভিযোগ কিংবা মামলা দায়ের না করে ঘটনা ধামাচাপা দিতে অভিযুক্ত কর্মকর্তা নাছিমা আক্তার গত ২৬ জুলাই বাদী হয়ে পুনরায় কুলিয়ারচর থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে একটি দায়সারা অভিযোগ দায়ের করেন। এলাকাবাসীর দাবি, প্রকৃত অপরাধীদের বাঁচাতে এবং নিজের দায় এড়াতেই তিনি ভিডিওতে দেখা যাওয়া চিহ্নিত ব্যক্তিদের নাম বাদ দিয়ে অজ্ঞাতনামা আসামি দেখিয়েছেন।
সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় প্রশাসনিক এই উদাসীনতায় স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। সচেতন নাগরিকদের দাবি, অভিযুক্ত নাছিমা আক্তারের বদলিই শেষ সমাধান হতে পারে না।
এলাকাবাসী ও স্থানীয় সচেতন মহল অবিলম্বে তদন্ত কমিটি গঠন করে ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা নাছিমা আক্তার ও অফিস সহায়ক রুকন উদ্দিনসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে দ্রুত তদন্ত করে ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি সরকারি জমি ও সম্পদ রক্ষায় স্থায়ী ও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিক ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
এব্যাপারে অভিযুক্ত রুকন উদ্দিনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমার বিরুদ্ধে আনিত সকল অভিযোগ মিথ্যা। গাছ কাটার বিষয়ে কুলিয়ারচর থানায় দুইটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে।
এব্যাপারে অভিযুক্ত নাছিমা আক্তারের সাথে যোগাযোগ করা হলে তার বিরুদ্ধে আনিত সকল অভিযোগ মিথ্যা দাবী করে বলেন, গাছ কাটার বিষয়ে কুলিয়ারচর থানায় তিনি দুইটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন। ভিডিও চিত্রে গাছ কাটার সকল তথ্য প্রামাণ থাকা সত্ত্বেও অভিযোগ লিপিতে আসামিদের নাম দেওয়া হয়নি কেন জানতে চাইলে তিনি কোন উত্তর দেননি।
এবিষয়ে কুলিয়ারচর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) কাজী আরিফ উদ্দীনের সাথে যোগাযোগ করা হলে নাছিমা আক্তারের লিখিত অভিযোগ পাওয়ার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, অভিযোগটিতে কারোর নাম উল্লেখ করা হয়নি। বাদীকে অভিযুক্তদের নাম উল্লেখ করতে বলা হলে তিনি কারোর নাম উল্লেখ করতে রাজি হননি। তার পরও বিষয়টি তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


Leave a Reply