বিশেষ প্রতিনিধি
গত দীর্ঘ ২০ বছর যাবৎ তিনি সুলতানুল আউলিয়া হযরত শাহ্ আলী বাগদাদী (রহ.)-এর মাজার প্রাঙ্গণে বসবাস করে আসছেন। এক লহমায় উনাকে দেখলে বোঝার উপায় নেই যে, এই হাসিমাখা মুখের আড়ালে লুকিয়ে আছে কতটা গভীর কষ্ট আর বুকফাটা দীর্ঘশ্বাস।
খুব অল্প বয়সেই মনোয়ারা বেগমের বিয়ে হয়েছিল। কোলজুড়ে এসেছিল একটি ফুটফুটে সন্তানও। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, যৌতুকের দাবি মেটাতে না পারায় স্বামী উনাকে মাঝপথে ফেলে চলে যায়। সেই ঝড় সামলে ওঠার আগেই উনার কোলের ছোট্ট শিশুটিও দুনিয়া ছেড়ে চলে যায়। স্বামী আর সন্তানকে হারিয়ে একাকী মনোয়ারা বেগম বেঁচে থাকার তাগিদে, এক বুক শূন্যতা নিয়ে নিজের গ্রাম ছেড়ে চলে আসেন অচেনা শহর ঢাকায়। এই নিরাশ্রয়, অসহায় নারীর শেষ আশ্রয়স্থল হয় হযরত শাহ্ আলী বাগদাদী (রহ.)-এর পুণ্যময় মাজার শরিফ।
বর্তমানে মনোয়ারা বেগম সারাদিন মাজার সংলগ্ন এলাকায় ঘুরে বেড়ান। রাস্তাঘাট থেকে মানুষের ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকের পানির বোতল কুড়িয়ে নেন। সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনির পর সেই বোতলগুলো বিক্রি করে মাত্র পঞ্চাশ থেকে ষাট টাকার মতো আয় হয় উনার। এর বাইরে মাজারের কিছু মানুষ উনাকে ভালোবেসে, দয়া করে খাবার বা সামান্য টাকা দেন। তবে জীবনের এই চরম সংকটেও তিনি কখনো কারও কাছে হাত পেতে ভিক্ষা চান না। উনার আহারের চাহিদাও খুব সামান্য—একটু চা আর বিস্কুট হলেই উনার চলে যায়; এমনকি টানা দুই-তিন দিন না খেয়ে থাকার মতো অমানুষিক ধৈর্যও উনার আছে।
সংসার ও আপনজন হারানো এই মানুষটির পৃথিবীতে সবচেয়ে প্রিয় জিনিস হলো ‘তসবিহ’। রওজা শরিফের সামনে বসে শান্ত মনে তসবিহ জপতে তিনি বড্ড ভালোবাসেন। আধ্যাত্মিক মগ্নতায় এক বসাতেই তিনি প্রায় ১০ হাজার বার আল্লাহর দরবারে জিকির করেন। উনার এই তসবিহ-প্রীতির কারণে উনাকে এক হাজার দানার তসবিহসহ এ যাবৎ বেশ কয়েকটি তসবিহ উপহার দেওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, প্রায়শই উনার সেই প্রিয় তসবিহগুলো হারিয়ে যায় কিংবা কেউ চুরি করে নিয়ে যায়।
মনোয়ারা বেগমের রাতের আশ্রয় খোলা আকাশ। মাজারের কাছাকাছি রাস্তার পাশেই তিনি রাত কাটান। রোদ, ঝড়, বৃষ্টি—বছরের পর বছর ধরে প্রকৃতির সব অত্যাচার সহ্য করে তিনি ওখানেই ঘুমিয়ে থাকেন। এই অরক্ষিত অবস্থায় রাস্তার পাশে ঘুমাতে গিয়ে বেশ কয়েকবার উনাকে কুকুরের কামড়ও খেতে হয়েছে।
একবার তিনি আমার কাছে বড় আকুতি নিয়ে অনুরোধ করেছিলেন, উনার জন্য যদি একটা ভাড়ায় বাসার ব্যবস্থা করে দেওয়া যেত। উনার খুব ইচ্ছে করে শান্তিতে, পবিত্র হয়ে নামাজ পড়তে; কিন্তু রাস্তাঘাটে তো আর সেই পরিবেশ মেলে না। তাছাড়া বছরের পর বছর মশা, মাছি আর ধুলোবালির মধ্যে থাকতে থাকতে উনার শরীর ও মন আজ বড্ড ক্লান্ত। মাথা গোঁজার একটুখানি ঠাঁই হলে হয়তো জীবনের শেষ দিনগুলো তিনি একটু শান্তিতে কাটাতে পারতেন।
কিন্তু নিষ্ঠুর বাস্তবতার কাছে উনার এই স্বপ্নটা ভীষণ অসহায়। একজন ভাসমান মানুষকে কে-ই বা বাসা ভাড়া দিতে চাইবে? তাছাড়া সারাদিন কাঁধে বস্তা ঝুলিয়ে প্লাস্টিকের বোতল কুড়িয়ে বেড়ানো এক নারীকে আমাদের সমাজ সহজে মেনে নিতে পারে না।
মনোয়ারা বেগমের জীবনে কষ্টের কোনো সীমা নেই, অথচ উনার সাথে দেখা হলে যে কেউ অবাক হবেন। সব দুঃখকে আড়াল করে, সারাক্ষণ এক টুকরো অমলিন হাসিমাখা মুখে তিনি দিব্যি জীবন পার করে দিচ্ছেন। উনার এই অমায়িক হাসি আর জীবনের প্রতি লড়াই আমাদের শেখায়—সব হারিয়েও কীভাবে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকা যায়।


Leave a Reply