গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার ডুমুরিয়া ইউনিয়নের উত্তর করফা গ্রামে একটি মৎস্য খামারে বিষ প্রয়োগ, মাছ চুরি এবং বাঁশের পাটা পুড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে দায়ের হওয়া একটি মামলা ঘিরে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। মামলায় ১৩ লাখ ৫০ হাজার টাকার ক্ষয়ক্ষতির দাবি করা হলেও স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ এবং মামলার কয়েকজন সাক্ষীর বক্তব্যে মামলার অভিযোগের সঙ্গে বাস্তব ঘটনার অসঙ্গতির বিষয়টি সামনে এসেছে।
বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে উত্তর করফা গ্রামের মো. ফোরকান শেখ (২৮) বাদী হয়ে প্রতিবেশী নিজাম শেখ (৫২), তাঁর দুই ছেলে খায়রুল শেখ (২৭) ও জহুরুল শেখ (২২) এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৫-৭ জনকে আসামি করে মামলাটি দায়ের করেন।
সরেজমিনে উত্তর করফা ও পাশের ঝনঝনিয়া এলাকায় গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অভিযুক্ত নিজাম শেখ দীর্ঘদিন ধরে দিনমজুরির কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। স্থানীয়দের অনেকেই তাঁকে সৎ, নিরীহ ও অসুস্থ ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করে মামলাটিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা রিপন শেখ বলেন, “আমার জানামতে নিজাম শেখ অত্যন্ত গরিব ও নিরীহ মানুষ। তাঁকে ফাঁসিয়ে ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদের উদ্দেশ্যেই এই মামলা করা হয়েছে। বাদী নিজে কাউকে আগুন দিতে দেখেননি, কেবল সন্দেহের ভিত্তিতে মামলা করেছেন।”
একই ধরনের বক্তব্য দেন প্রতিবেশী বাদশা মিয়া শিকদার ও আব্দুল আলী শেখ। তাঁদের ভাষ্য, “২০১৪ সাল থেকে আমরা নিজাম শেখকে চিনি। তিনি দিনমজুরি করে সংসার চালান এবং দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। তাঁর পক্ষে এমন ঘটনা ঘটানো বিশ্বাস করা কঠিন।”
ঘটনার রাত সম্পর্কে স্থানীয়দের বক্তব্যও মামলার অভিযোগের সঙ্গে পুরোপুরি মিল খায় না। স্থানীয় বাসিন্দা আরিফুল ইসলাম আরজু বলেন, “রাতে হঠাৎ আগুন লাগলে আসামিপক্ষই প্রথম চিৎকার করে। তাদের ডাক শুনে আমরা ঘটনাস্থলে যাই এবং কয়েকজন মিলে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনি।”
মামলার আরজিতে অভিযোগ করা হয়েছে, গত ১ জুলাই ২০২৬ রাতে আসামিরা পেট্রোল দিয়ে বাঁশের পাটায় আগুন লাগিয়ে দেন এবং বাদীকে মারধর করেন। তবে এ বিষয়ে বাদী ফোরকান শেখের বক্তব্যে ভিন্ন চিত্র উঠে আসে।
তিনি বলেন, “এর আগে আমার মাছের ঘেরে বিষ দেওয়া হয়েছিল। এরপর ওদের একজন আমাকে হুমকি দেয়। পরে আবার পাটায় আগুন লাগে। হুমকি এবং ঘটনার ধারাবাহিকতা দেখে আমার মনে হয়েছে তারাই করেছে।”
বাদীর এই বক্তব্য থেকে অভিযোগটি প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে নয়, বরং সন্দেহ ও অনুমানের ভিত্তিতে করা হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়।
মামলার সাক্ষীদের বক্তব্যেও দেখা গেছে অসঙ্গতি। ৩ নম্বর সাক্ষী হাবিবুর তালুকদার বলেন, “আমি তখন ঘুমিয়ে ছিলাম। চিৎকার শুনে ঘুম থেকে উঠে ওপারে আগুন জ্বলতে দেখি।” পরে তাঁকে প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী হওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি এ বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
অন্যদিকে, মামলার ২ নম্বর সাক্ষী ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি না হলেও বলেন, “মামলা যেহেতু আদালতে রয়েছে, আদালত ডাকলে সেখানেই আমার বক্তব্য দেব।”
মামলার প্রধান আসামি নিজাম শেখ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমি গুরুতর অসুস্থ। ঘটনার একদিন আগে ১৪ দিন চিকিৎসা শেষে গোপালগঞ্জ হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরেছি। আগুন লাগার সময় আমরাই প্রথম চিৎকার করি। আমাদের ডাক শুনে লোকজন এসে আগুন নেভায়। কে বা কারা আগুন দিয়েছে তা আমি জানি না। পরিকল্পিতভাবে আমাদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করতেই এই মিথ্যা মামলা করা হয়েছে।”
এ বিষয়ে সচেতন মহলের অভিমত, মামলাটি বিচারাধীন হওয়ায় আদালতের মাধ্যমে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই প্রকৃত সত্য উদঘাটন হওয়া উচিত। বাদীর বক্তব্য, সাক্ষীদের বর্ণনা এবং স্থানীয়দের দাবি—সব মিলিয়ে ঘটনায় একাধিক প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ফলে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও তদন্তকারী সংস্থার পক্ষ থেকে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিক তদন্তের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।


Leave a Reply