মৌসুমী ফলের সুবাস ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধন ক্রেতা-বিক্রেতাদের পদচারণায় মুখরিত ঐতিহ্যবাহী বাউসি বাজার
মোঃ আনোয়ার হোসাইন
বিশেষ প্রতিনিধি(জামালপুর)
বাঙালির গ্রামীণ ঐতিহ্য আর লোকজ সংস্কৃতির এক অপূর্ব মিলনমেলা বসেছে ঐতিহ্যবাহী বাউসি হাটে। জ্যৈষ্ঠের আগমনী বার্তার সাথে সাথে ক্রেতা-বিক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়ে এখন পুরোদমে জমে উঠেছে এই অঞ্চলের অন্যতম প্রধান এই হাটটি। গ্রামীণ জনপদের মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি এই হাটটি রূপ নিয়েছে এক উৎসবমুখর মিলনক্ষেত্রে।
হাটে পা রাখতেই চোখে পড়ে সারি সারি ফলের দোকান। জ্যৈষ্ঠের মধু মাসের শুরুতেই বাজারে বাহারি ফলের সমারোহ। বিশেষ করে মৌসুমী ফল লিচুর আমদানি রসনাবিলাসীদের দারুণভাবে আকৃষ্ট করছে। টকটকে লাল টসটসে লিচুর থোকা সাজিয়ে বসে আছেন বিক্রেতারা। শুধু লিচুই নয়, আম, কাঁঠালসহ নানাবিধ দেশীয় ফলে ভরে উঠেছে বাজার। দূর-দূরান্ত থেকে আসা পাইকার ও স্থানীয় ক্রেতাদের দরদাম আর হাঁকডাকে মুখরিত চারপাশ।
গ্রাম বাংলার হাটের কথা ভাবলেই সবার আগে চোখে ভাসে গরম-গরম জিলাপি আর মচমচে পিঁয়াজুর ছবি। বাউসি বাজারও এর ব্যতিক্রম নয়। হাটের এক কোণে বড় বড় কড়াইয়ে চলছে জিলাপি ভাজার উৎসব। কারিগরদের হাতের ছোঁয়ায় তৈরি হওয়া প্যাঁচানো গরম জিলাপির সুবাস চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। পাশেই ভাজা হচ্ছে গরম পিঁয়াজু আর চপ। হাটে আসা মানুষ কেনাকাটার ফাঁকে একটু জিরিয়ে নিতে ভিড় করছেন এসব দোকানে। কেউ সেখানেই খাচ্ছেন, আবার কেউ মাটির হাঁড়ি বা ঠোঙায় করে পরিবারের জন্য নিয়ে যাচ্ছেন এই ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি ও মুখরোচক খাবার।
হাটের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো এর মাছের বাজার। স্থানীয় নদী, নালা এবং বিল থেকে ধরে আনা দেশীয় প্রজাতির তাজা মাছের পসরা সাজিয়ে বসেছেন জেলেরা। রুই, কাতলা, মৃগেল থেকে শুরু করে টেংরা, পুঁটি, আইড় এবং শোল মাছের প্রাচুর্য লক্ষ্য করা গেছে। জ্যান্ত মাছের জন্য ক্রেতাদের মধ্যে রীতিমতো প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে। বিক্রেতারা জানান, বাউসি হাটের মাছের সুনাম থাকায় প্রতি হাটেই দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ মাছ কিনতে আসেন।
বাঙালি সংস্কৃতির চিরায়ত নিয়ম—খাওয়া-দাওয়া শেষে এক খিলি পান না হলে যেন তৃপ্তিই আসে না। গ্রাম বাংলার মানুষ অতিথি আপ্যায়ন কিংবা নিজেদের ক্লান্তি দূর করতে যে উপাদানটি সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেন, তা হলো পান-সুপারি। বাউসি হাটের পান-সুপারির দোকানগুলোতে তাই তিল ধারণের ঠাঁই নেই। মিষ্টি জর্দা, চুন, খয়ের আর সুগন্ধি মশলা দিয়ে তৈরি হচ্ছে বিশেষ খিলি পান। হাটের কেনাকাটা ও খাওয়া-দাওয়া শেষ করে তৃপ্তির হাসি মুখে নিয়ে এক খিলি পান গালে পুরে বাড়ির পথ ধরছেন নানা বয়সী মানুষ।
স্থানীয় প্রবীণদের মতে, বাউসি বাজার শুধু কেনাকাটার স্থান নয়, এটি এই অঞ্চলের মানুষের সামাজিক মেলবন্ধনের একটি বড় মাধ্যম। আধুনিক সুপারশপের যুগেও গ্রামীণ এই হাটের আবেদন একটুও কমেনি, বরং দিন দিন এর পরিধি ও ব্যস্ততা আরও বাড়ছে। ক্রেতা ও বিক্রেতা—উভয় পক্ষের সন্তুষ্টিতে বাউসি বাজারের এই হাটটি গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল রাখার পাশাপাশি টিকিয়ে রেখেছে আমাদের শত বছরের পুরনো ঐতিহ্য।


Leave a Reply