কুলিয়ারচরে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে নানান অনিয়মের অভিযোগ; অপসারণের দাবি এলাকাবাসীর
মুহাম্মদ কাইসার হামিদ
কুলিয়ারচর (কিশোরগঞ্জ):
কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার ৪৩ নং দড়িগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মাহমুদা আক্তারের বিরুদ্ধে নানান অনিয়ম, দুর্নীতি এবং এলাকাবাসীর সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে নিজের মনমতো স্কুল ব্যবস্থাপনা কমিটি (এসএমসি) গঠনের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। এর প্রতিবাদে ও উক্ত শিক্ষকের অপসারণের দাবিতে এলাকায় এক প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
রোববার (২৮ জুন) সকাল ১১টার দিকে ওই বিদ্যালয় মাঠে বিদ্যালয়ের অভিভাবক, গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও এলাকাবাসীর আয়োজনে এই প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সাবেক সভাপতি ও স্থানীয় ২নং ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য মহর উদ্দিনের সভাপতিত্বে সভায় বক্তব্য রাখেন, স্থানীয় সালুয়া ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য কামরুল হাসান, বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সাবেক সভাপতি মো. মনিরুজ্জামান, এলাকাবাসীর পক্ষে মো. বাবুল মিয়া, মো. জসিম উদ্দিন, লিটন মিয়া, আইন উদ্দিন, আনোয়ার হোসেন, শামসু মিয়া এবং কামরুজ্জামান মেরাজ প্রমুখ।
প্রতিবাদ সভা শেষে দুপুরে এলাকাবাসীর পক্ষে ২০ জনের স্বাক্ষরিত দু’টি লিখিত অভিযোগ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ও উপজেলা শিক্ষা অফিসার বরাবর জমা দেওয়া হয়। আবেদনে মাহমুদা আক্তারকে অপসারণ করে একজন যোগ্য নতুন প্রধান শিক্ষক বা ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক পদায়নের দাবি জানানো হয়।
প্রতিবাদ সভায় বক্তারাসহ এলাকাবাসী অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন যাবৎ সুনামের সাথে বিদ্যালয়টির কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছিল। কিন্তু মাহমুদা আক্তার ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বিদ্যালয়টিতে বিভিন্ন প্রকার অনিয়ম জেঁকে বসেছে। এছাড়া বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের প্রশাসনিক দুর্বলতায় দপ্তরী কাম নৈশপ্রহরী মো. এমাদ মিয়া’র দায়িত্ব পালনে অবহেলায় প্রতিদিন রাতে বিদ্যালয় চত্বরে মাদক ও জুয়ার আড্ডা হওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
তারা আরো অভিযোগ করে বলেন, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মাহমুদা আক্তার স্লিপের (SLIP) বরাদ্দকৃত টাকা স্কুল ম্যানেজমেন্ট কমিটির (এসএমসি) অগোচরে স্বেচ্ছাচারীভাবে ভুয়া ভাউচার ও জাল স্বাক্ষরের মাধ্যমে উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেছেন। এছাড়া মা দিবস এবং বিভিন্ন জাতীয় দিবস পালনের নামে নামমাত্র খরচ দেখিয়ে বা দিবস পালন না করেই ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে টাকা আত্মসাৎ করার দাবিও করা হয়। এমনকি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে ‘ম্যানেজ’ করার কথা বলেও বিভিন্ন সময় খরচের খাত দেখিয়েছেন এমন অভিযোগ রয়েছে মাহমুদা আক্তারের বিরুদ্ধে।
অভিযোগে আরও জানা যায়, সাবেক শিক্ষার্থীরা প্রত্যয়নপত্র নিতে গেলে তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ করা হয়। এছাড়া ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক তাঁর নিজ বাড়িতে শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট বা কোচিং পড়তে বাধ্য করেন। কেউ রাজি না হলে পরীক্ষার খাতায় নম্বর কম দেওয়ার ভয় দেখানো তাঁর নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু তাই নয়, কোন শিক্ষার্থীর জন্মনিবন্ধন বা অন্য কোনো কাজের জন্য স্কুল প্রত্যয়নপত্র প্রয়োজন হলে ডুমরাকান্দা বাজারস্থ তার স্বামীর কম্পিউটার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে কাজ না করালে কোন অভিভাবকের সন্তানের নামে (শিক্ষার্থী) প্রত্যয়নপত্র ইস্যু করেন না তিনি। অভিভাবকদের সাথে দুর্ব্যবহার এবং স্কুল চলাকালীন সময়ে অফিসের কাজের অজুহাতে স্কুল ত্যাগ করাও তাঁর নিয়মিত রুটিনে পরিণত হয়েছে বলে দাবি করেন এলাকাবাসী।
এলাকাবাসী আরো অভিযোগ করে বলেন, গত ১৪ মে কমিটি গঠন নিয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক এলাকাবাসীকে নিয়ে একটি মিটিং করেন। অভিভাবক ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে কোন প্রকার নির্বাচন ছাড়াই সর্বসম্মতিক্রমে বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সাবেক সভাপতি মো. মনিরুজ্জামান-কে পুনরায় সভাপতি নির্বাচন করে একটি খসড়া কমিটি গঠন করে অনুমোদনের জন্য প্রেরণের সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু সেই কমিটি নিজের মনমতো না হওয়ায়, পূর্ববর্তী কোনো নোটিশ ছাড়াই গত ২৫ জুন আবারও একটি মিটিং ডাকেন তিনি। উক্ত মিটিংয়ে বেশ কয়েকজন সদস্যের অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে ওই বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক তানিয়া বেগমের পিতা অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন-কে সভাপতি হিসেবে নিয়োগের চেষ্টা করা হয়। এছাড়া সর্বসম্মতিক্রমে মনোনীত স্থানীয় সালুয়া ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য কামরুল হাসানের সদস্য পদ বাদ দিয়ে স্কুলের দপ্তরি কাম নৈশপ্রহরী মো. এমাদ উদ্দিনের মা সালুয়া ইউনিয়ন পরিষদের ১,২ ও ৩ নং ওয়ার্ডের সংরক্ষিত মহিলা সদস্য মোছা. জামেনা-কে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করা হলে বেশ কয়েকজন অভিভাবক সদস্য আপত্তি জানিয়ে মিটিং বয়কট করেন।
এলাকাবাসী ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মাহমুদা আক্তারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের বিষয়ে বিগত ২০২৪ সালের ৮ সেপ্টেম্বর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) এবং উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার বরাবর দু’টি লিখিত অভিযোগ দাখিল করা হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হলেও এখন পর্যন্ত সেই বিষয়ে কোনো সুরাহা মেলেনি।
বর্তমানে এই শিক্ষকের কর্মকাণ্ডে এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে উক্ত ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে অবিলম্বে অপসারণ করে নতুন কাউকে দায়িত্ব দেওয়ার জন্য প্রশাসনের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মাহমুদা আক্তারের সাথে যোগাযোগ করা হলে তার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন দাবি করে বলেন, “সম্পূর্ণ নিয়ম মেনেই বিদ্যালয়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। সালুয়া ইউনিয়ন পরিষদের ১,২ ও ৩ নং ওয়ার্ডের সংরক্ষিত মহিলা সদস্য মোছা. জামেনা-কে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য ইউপি চেয়ারম্যান মহোদয় নিজেই মনোনীত করে একটি চিঠি দিয়েছেন। অপর দিকে বিদ্যালয়ের দাতা সদস্য মো. মনিরুজ্জামান-কে মোবাইল মেসেঞ্জারে মিটিংয়ের বিষয়ে অবগত করা হলেও তিনি ২৫ জুনের মিটিংয়ে উপস্থিত হননি এবং অপর এক অভিভাবক সদস্য মুক্তা আক্তারের সিজারিয়ান অপারেশন হওয়ায় তিনিও উপস্থিত হতে পারেননি। তিনি মোবাইল ফোনে সভাপতি নির্বাচনের বিষয়টি সম্মতি দিয়েছেন। এসময় সভাপতি পদে অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা মো. আনোয়ার হোসেন (আঙ্গুর) প্রার্থীতা ঘোষণা করলে আর কেউ সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বীতা না করায় উপস্থিত সকলের সর্বসম্মতিক্রমে আনোয়ার হোসেন-কে সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। যার প্রমান সভাপতি নির্বাচনের রেজুলেশনে উপস্থিত সকলের স্বাক্ষর। তিনি আরো বলেন, শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্যই আমি উক্ত বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরকে বাড়িতে এনে প্রাইভেট পড়াই। আমি চাই সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে আমার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগের বিষয়ে সত্য উদ্ঘাটিত হোক।”
অপর দিকে বিদ্যালয়ের দপ্তরী কাম নৈশপ্রহরী মো. এমাদ মিয়া বলেন, তার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন।
এ বিষয়ে উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আনিসুর রহমান এলাকাবাসীর লিখিত অভিযোগ পাওয়ার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। অন্যদিকে, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. মাসুদুর রহমান জানান, বিষয়টি তিনি অবগত হয়েছেন এবং তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


Leave a Reply