সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ ১৯২২ সালের ১৫ আগস্ট তিনি চট্টগ্রামের ষোলশহরের একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।
তাঁর পৈত্রিক নিবাস বৃহত্তর চট্টগ্রামের নোয়াখালীতে হলেও নানার বাড়ি চট্টগ্রামে। তার মা নাসিম আরা খাতুন ছিলেন চট্টগ্রামের এক ঐতিহ্যবাহী বংশের সন্তান। আর পিতা সৈয়দ আহমদউল্লাহ ছিলেন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা।
মাত্র আট বছর বয়সে ওয়ালীউল্লাহ্ তাঁর মাকে হারিয়েছেন। পিতার কর্মসূত্রে তাঁর শৈশব, কৈশোর ও যৌবনকাল কেটেছে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে। ফলে পুরো বাংলার নানান বৈচিত্র্যময় মানুষের জীবন ও সংস্কৃতি তিনি খুব কাছ থেকে অবলোকন করেছেন। মানুষের জীবন ও সমাজকে পর্যবেক্ষণ করেছেন গভীরভাবে। এর ছাপ পাওয়া যায় তাঁর উপন্যাস ও নাটকের চরিত্র ও সমাজভাবনায়।
কুড়িগ্রাম উচ্চবিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক (১৯৩৯), ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট (১৯৪১) এবং ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজ থেকে বি.এ পাশ করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পাকিস্তান সরকারের পররাষ্ট্র দপ্তরের সাথে যুক্ত থাকায় কর্মজীবনের অধিকাংশ সময়ই কেটেছে বিদেশে। ১৯৫৫ সালে ফরাসি আন মারী-র সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর সাহিত্যকর্ম বাংলা সাহিত্যে বিশেষ মর্যাদার অধিকারী। ব্যক্তি ও সমাজের গূঢ় সত্য উন্মোচন করাই তাঁর প্রধান কাজ। কুসংস্কার ও অন্ধ ধর্মবিশ্বাসের স্বরূপ অকপটে তুলে ধরেছেন তাঁর সাহিত্যে।
ধর্মের ভিত্তিতে হওয়া ১৯৪৭ এর দেশভাগের পর বাংলাদেশের প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর বিখ্যাত ‘লালসালু’। এ যেন ধর্মীয় গোড়ামীর বিরুদ্ধে কঠোর কুঠারাঘাত। গ্রামের সরল মানুষের সরলতার সুযোগ নিয়ে, ধর্মকে ব্যবহার করে মজিদ কীভাবে নিজের স্বার্থ হাসিল করে নেয় তারই নিখুঁত চিত্র অঙ্কিত হয়েছে লালসালু উপন্যাসে।
মানুষ ও মানুষের অস্তিত্ব, লোভ, ভীতি, ঈর্ষার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে হাতে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন সমাজের গলদ কোথায়। সমাজ ও সমাজের মানুষ তাঁর আরাধ্য বিষয়।
তাঁর সাহিত্যকর্মও তাঁর জীবনের মতোই বৈচিত্র্যময়। ছোটগল্প, উপন্যাস ও নাটকসহ নানান ক্ষেত্রে তাঁর সফল পদচারণা।নয়নচারা (১৯৪৫) ও দুই তীর ও অন্যান্য গল্প তার বিখ্যাত গল্পগ্রন্থ। লালসালু (১৯৪৮), চাঁদের অমাবস্যা (১৯৬৪) ও কাঁদো নদী কাঁদো (১৯৬৮) তাঁর জনপ্রিয় উপন্যাস। তাঁর রচিত নাটক বহিপীর (১৯৬০), উজানে মৃত্যু (১৯৬৩), তরঙ্গভঙ্গ (১৯৬৪) ও সুড়ঙ্গ (১৯৬৪) বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান নীরিক্ষাধর্মী নাটক। তাঁর অধিকাংশ সাহিত্যে ‘অস্তিত্ববাদ’ দার্শনিক তত্ত্বের প্রকাশ ঘটেছে।
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ছোটগল্পগুলো প্রকরণে প্রথাবিরোধী ও আধুনিক এবং অনেকটা চরিত্রনির্ভর। মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ তাঁর ছোটগল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্য। বাঙালির ব্যক্তি-জীবন, সমাজ-সমস্যা,দেশভাগ, দুর্ভিক্ষ, সামাজিক কুসংস্কার, মূল্যবোধের অবক্ষয় ও মানসিক স্খলনপতন তাঁর ছোটগল্পের প্রধান বিষয়।
১৯৭১ সালের ১০ অক্টোবর মাত্র ৪৯ বছর বয়সে প্যারিসে মারা যান। সেখানেই তাকে সমাহিত করা হয়।


Leave a Reply