যে কারণে ফাঁসি হচ্ছে না সেই রিফাত শরীফের হত্যাকারী মিন্নির
নিজস্ব প্রতিবেদক:
২০১৯ সালের ২৬ জুন বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে হত্যা করা হয় শাহনেওয়াজ রিফাত শরীফকে।
দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করা এই হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে ২০২০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর রিফাতের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিসহ ছয়জনকে মৃত্যুদণ্ড দেন বরগুনার জেলা ও দায়রা জজ আদালত।
এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও মিন্নির ফাঁসি কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। মৃত্যুদণ্ড মাথায় নিয়ে মিন্নি বর্তমানে কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারের কনডেম সেলে বন্দি জীবন কাটাচ্ছেন। আইনি জটিলতা, উচ্চ আদালতে আপিল ঝুলে থাকা এবং বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসের একটি বিশেষ ঐতিহ্যের কারণে মিন্নির এই দণ্ড কার্যকর হতে দীর্ঘ সময় লাগছে।
উচ্চ আদালতে আপিল ও ডেথ রেফারেন্স শুনানি
বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী,নিম্ন আদালত কাউকে মৃত্যুদন্ড দিলেই তা সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর করা যায় না।ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৭৪ ধারা মোতাবেক,এই দণ্ড কার্যকরের জন্য হাইকোর্ট বিভাগের অনুমোদনের(ডেথ রেফারেন্স)প্রয়োজন হয়। নিম্ন আদালতের রায়ের পর মামলাটি হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স হিসেবে আসে এবং আসামিপক্ষও খালাস চেয়ে আপিল দায়ের করে। মিন্নির আইনজীবীরাও উচ্চ আদালতে আপিল করেছেন। দেশের উচ্চ আদালতে হাজার হাজার মামলার জট থাকার কারণে এই ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানি শুরু হতে এবং তা নিষ্পত্তি হতে বছরের পর বছর সময় লেগে যায়। উচ্চ আদালতের চূড়ান্ত রায় না আসা পর্যন্ত কোনো আসামির ফাঁসি কার্যকর করা আইনত অসম্ভব।
দেশের বিচারিক ইতিহাস ও অলিখিত ঐতিহ্য
বাংলাদেশের আইনি ইতিহাসে একটি অনন্য বিষয় হলো—১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে আজ পর্যন্ত কোনো নারী আসামির ফাঁসি কার্যকর করা হয়নি। বিভিন্ন জঘন্য অপরাধের দায়ে নিম্ন আদালতে শতাধিক নারীর মৃত্যুদণ্ডের আদেশ হলেও উচ্চ আদালতে আপিলের পর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নারীদের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন বা আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়ার এক অলিখিত প্রবণতা দেখা গেছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর চাপ এবং লিঙ্গভিত্তিক বিশেষ সহানুভূতির কারণে নারীদের ক্ষেত্রে আদালত অনেক সময় বিকল্প শাস্তির পথ বেছে নেয়। মিন্নির ক্ষেত্রেও আপিল বিভাগে সাজা কমে যাওয়ার একটি আইনি সম্ভাবনা রয়েছে।
আপিল বিভাগ ও রিভিউ আবেদন হাইকোর্ট বিভাগ মিন্নির ফাঁসির রায় বহাল রাখল। এরপরও মিন্নির সামনে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করার সুযোগ থাকবে। সেখানেও যদি মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকে,তবে তিনি সেই রায়ের বিরুদ্ধে’রিভিউ’বা পুনর্বিবেচনার আবেদন করতে পারবেন।এই পুরো আইনি চক্রটি শেষ হতে সাধারণত ৫ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়।
রাষ্ট্রপতির ক্ষমাপ্রার্থনা ও কনডেম সেলের বাস্তবতা
আইনি সব পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির সামনে সর্বশেষ সুযোগ থাকে সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাওয়া। রাষ্ট্রপতি সেই আবেদন নাকচ করলে তবেই কেবল ফাঁসি কার্যকরের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেওয়া হয়। মিন্নি বর্তমানে যে কাশিমপুর মহিলা কারাগারে আছেন,সেখানে কোনো ফাঁসির মঞ্চও নেই।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে,উচ্চ আদালতে মিন্নির আপিল মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তার ফাঁসি কার্যকর হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ফলে কনডেম সেলের চার দেওয়ালের মাঝেই কাটছে তার প্রতিটি মুহূর্ত, যেখানে আইনি লড়াইয়ের চূড়ান্ত ফলাফলের ওপর নির্ভর করছে তার জীবন কিংবা মৃত্যু।


Leave a Reply