নিজস্ব প্রতিবেদক:
বাংলাদেশে বাউল-ফকিরদের ওপর হামলা, মামলা ও সামাজিক হয়রানি দীর্ঘদিনের একটি বাস্তবতা। সম্প্রতি জীব বনাম পরম নিয়ে একটি পালাগানে দার্শনিক প্রশ্ন তোলার অভিযোগে বাউল আবুল সরকারকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অভিযোগ তোলা হয়েছে ধর্মীয় অবমাননার—যা বাংলাদেশের শিল্প ও চিন্তার জগতে প্রায়ই ব্যবহৃত হয় মতপ্রকাশ নিয়ন্ত্রণ ও শিল্পীকে ভয়ভীতি প্রদর্শনের হাতিয়ার হিসেবে। এর আগেও সদ্য ক্ষমতাচ্যুত সরকারের আমলে শরীয়ত বয়াতি, রীতা দেওয়ানের মতো একাধিক বাউল শিল্পী একই ধারার হয়রানির শিকার হয়েছেন। অভিযোগের ধরন ও ব্যবহৃত আইনগুলো দেখে স্পষ্ট হয়, এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং একটি সাংস্কৃতিক দমনচর্চার পুনরাবৃত্তি।
এই দেশটিতে যে সরকারই ক্ষমতায় এসেছে, ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর চাপ, ভোটের হিসাব এবং রাজনৈতিক সুবিধাবাদের কারণে বাউল নির্যাতন কার্যত বন্ধ হয়নি। বরং অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্র নীরব থেকে এমন অভিযোগকারীদের মনোবল বাড়িয়েছে। মৌলবাদী গোষ্ঠী জানে, “ধর্মীয় অনুভূতি আঘাত” আইনের অপপ্রয়োগের সুযোগ থাকলে যেকোনো শিল্পীকে চিহ্নিত করে দমন করা যায়; এবং রাষ্ট্র যদি সক্রিয়ভাবে প্রতিরোধ না করে, তাহলে এই আইনই হয়ে ওঠে দুর্বল মানুষের বিরুদ্ধে শক্তিশালীদের অস্ত্র। এ কারণেই বাউলদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ, সামাজিক হেনস্তা ও গ্রেফতারের ঘটনা বারবার ঘটছে, অথচ খুব কম ক্ষেত্রেই প্রকৃত বিচার বা সুরক্ষা নিশ্চিত হয়।
বাউলদের দর্শন—জীব ও পরমের সম্পর্ক, মানবধর্ম, আত্ম-অন্বেষণ ও প্রশ্ন তোলার স্বাভাবিক স্বাধীনতা—বাংলাদেশের দীর্ঘ সাংস্কৃতিক পরম্পরায় একটি মানবিক আলো। কিন্তু এই প্রশ্নমুখী, মুক্তচিন্তার ধারা যে কট্টর গোষ্ঠীর কাছে অস্বস্তিকর, সেটাও সত্য। ফলে যখনই কোনো বাউল শিল্পী দার্শনিক বিতর্ক উত্থাপন করেন, তখনই তিনি ঝুঁকির মধ্যে পড়েন। সামাজিকভাবে আক্রমণ, ধর্মীয় তকমা, এবং আইনি হয়রানি—সব কিছু মিলিয়ে একটি নিরাপত্তাহীন পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে শিল্পীদের স্বাধীনতা প্রায়ই প্রশ্নের মুখে পড়ে। আবুল সরকার হয়তো আন্দোলন ও জনচাপের কারণে জামিন পাবেন, কিন্তু দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অসংখ্য নামহীন বাউল নীরবে নির্যাতিত হন; তাদের হয়ে কেউ দাঁড়ায় না।
এই অবস্থার অবসান ঘটাতে হলে সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী, সংখ্যালঘু সমাজ, সুফি-তরিকা, নাগরিক সমাজ এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোকে একজোট হয়ে কাজ করতে হবে। আইনগতভাবে “ধর্মীয় অনুভূতি” ধারা যেভাবে অপপ্রয়োগ করা হয় তা নিয়ন্ত্রণ এবং এর অপব্যবহার বন্ধে সংশোধন প্রয়োজন। সেই সঙ্গে দরকার এমন একটি সুরক্ষা কাঠামো—যেখানে শিল্পী বা দরিদ্র বাউলদের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ সহজে মামলা বা গ্রেফতারে রূপ নিতে না পারে। একটি “মজলুম সুরক্ষা আইন” বা সমতুল্য নিরাপত্তা কাঠামো এই প্রেক্ষিতে জরুরি, যাতে ভুক্তভোগীরা রাষ্ট্র ও আইনের আশ্রয় পায়।
ক্রমবর্ধমান এই অসহিষ্ণুতা কেবল বাউল নির্যাতনের বিষয় নয়—এটি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব, মানবিক মূল্যবোধ ও মুক্তচিন্তার ভবিষ্যতের প্রশ্ন। রাষ্ট্র যদি নীরব থাকে এবং সমাজ যদি বিভক্ত থাকে, তাহলে মৌলবাদ আরও শক্তিশালী হবে। কিন্তু যদি আমরা সম্মিলিতভাবে দাঁড়াই, শিল্প ও মানবধর্মের পক্ষে কণ্ঠ তুলি, এবং আইনকে ন্যায়ের পথে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হই—তাহলেই এই দীর্ঘদিনের নির্যাতনের চক্র ভাঙ্গা সম্ভব। বাউলদের সুর বাঁচলে—বাংলাদেশের মনন, মানবিকতা ও সহিষ্ণুতার ঐতিহ্যও বাঁচবে।


Leave a Reply