২৯ অক্টোবর ২০২৬
বান্দরবানের থানচি উপজেলায় ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, উৎসাহ-উদ্দীপনা ও নানা বর্ণিল আয়োজনের মধ্য দিয়ে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব মাহা ওয়াগ্যোয়াই পোওয়ে (প্রবারণা পূর্ণিমা) সম্পন্ন হয়েছে। গত ২৫ অক্টোবর শুরু হওয়া পাঁচ দিনব্যাপী এ উৎসব বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়। এতে উপজেলার প্রায় ১১৫টি মারমা গ্রামের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা অংশ নেন।

উৎসব উপলক্ষে বর্ণাঢ্য ক্কলোমপঙ্খি রথ নির্মাণ ও শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। পরে সাঙ্গু নদীতে রথ বিসর্জনের মধ্য দিয়ে উৎসবের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্ব সম্পন্ন হয়। এ ছাড়া ধর্মদেশনা, পঞ্চশীল ও অষ্টশীল গ্রহণ, পবিত্র ত্রিপিটক পাঠ, পিণ্ডদান, বাহারি পিঠা তৈরি, ঘিলা খেলা, হাজার প্রদীপ প্রজ্বালন, ফানুস ওড়ানো, টাকার কল্পতরু দান, মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং ঐতিহ্যবাহী জাইকহ্ নৃত্য পরিবেশিত হয়। উৎসবকে আরও প্রাণবন্ত করতে উদ্‌যাপন কমিটির উদ্যোগে ফুটবল খেলারও আয়োজন করা হয়।

আয়োজক কমিটি সূত্রে জানা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামের মারমা, চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যা ও বড়ুয়া সম্প্রদায়ের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে মাহা ওয়াগ্যোয়াই পোওয়ে বা প্রবারণা পূর্ণিমা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি ধর্মীয় উৎসব। এ উৎসবকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন বৌদ্ধবিহারে ধর্মীয় প্রার্থনা, বুদ্ধস্নান, ধর্মদেশনা, ভিক্ষুদের ছোয়াইন (ভোজন) দান, ফানুস ওড়ানো, প্রদীপ প্রজ্বালন এবং নানা ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এসব আয়োজনের মধ্য দিয়ে ধর্মীয় মূল্যবোধ, সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তুলে ধরা হয়।

উৎসবের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সার্বিক তত্ত্বাবধান ও সহযোগিতায় উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল-ফয়সাল, থানচি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কানন সরকার, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রীর প্রতিনিধি মংশৈম্রাই মারমা, জেলা পরিষদের সাবেক সদস্য অ্যাডভোকেট উবাথোয়াই মারমা, থানচি প্রেসক্লাবের সভাপতি মংবোওয়াংচিং মারমা অনুপম, বিএনপি নেতা শৈবাথোয়াই মারমা ও মংএনু মারমা এবং কৃষক দলের নেতা মংসাগ্য মারমা।

এ ছাড়া উৎসব উদ্‌যাপন কমিটির সভাপতি বাবু মারমা, সাধারণ সম্পাদক জয় মারমা, সাবেক ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান উবামং মারমা এবং তিন্দু ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী থোয়াইসিংমং মারমা উপস্থিত থেকে উৎসব আয়োজনে সহযোগিতা করেন।

উৎসব উদ্‌যাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক জয় মারমা বলেন, “প্রথমবারের মতো মাহা ওয়াগ্যোয়াই পোওয়ে (প্রবারণা) উৎসব আয়োজনের দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেয়েছি। বৌদ্ধ ধর্মের ঐতিহ্যবাহী এ পবিত্র উৎসবে সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ আনন্দ-উৎসাহের সঙ্গে অংশ নিয়েছেন। সবার অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা আমাদের অনুপ্রাণিত করেছে। এ অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে সমাজের কল্যাণে কাজ করতে আরও উৎসাহ জোগাবে।”

কমিটির কোষাধ্যক্ষ উশৈওয়ান মাস্টার বলেন, “সবার আন্তরিক সহযোগিতায় বৌদ্ধ ধর্মের ঐতিহ্যবাহী ও পবিত্র এ উৎসব যথাযথভাবে আয়োজন করা সম্ভব হয়েছে। উৎসবকে কেন্দ্র করে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে আনন্দ-উচ্ছ্বাস ও সম্প্রীতির পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। ভবিষ্যতেও এ ঐতিহ্য ধরে রাখতে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।”

উল্লেখ্য, বৌদ্ধ ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী, বর্ষাবাসের তিন মাস বৌদ্ধ ভিক্ষুরা নির্দিষ্ট বিহারে অবস্থান করে ধর্মীয় সাধনা ও ধ্যানচর্চায় নিয়োজিত থাকেন। বর্ষাবাস শেষে আশ্বিনী পূর্ণিমায় প্রবারণা উৎসব উদ্‌যাপিত হয়। এ সময় বৌদ্ধ ভিক্ষুরা প্রবারণা সম্পন্ন করেন এবং বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা প্রার্থনা, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও নানা সামাজিক-সাংস্কৃতিক আয়োজনের মধ্য দিয়ে দিনটি পালন করেন। থানচিতে এ উৎসব স্থানীয় মারমা সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।