বান্দরবানের থানচি উপজেলায় প্রবারণা পূর্ণিমা ও শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে উৎসব উদযাপনের জন্য বরাদ্দকৃত চাল নগদায়ন করে বিতরণ এবং তাতে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ৮৩টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের জন্য বরাদ্দকৃত চাল ডিও লেটারের মাধ্যমে টাকায় রূপান্তর করার পর মাত্র ২২টি বৌদ্ধবিহার ও ২টি দুর্গাপূজা মণ্ডপ পূর্ণ টাকা পেয়েছে। অন্যদিকে, বাকি ৫৯টি বৌদ্ধবিহার ও ক্রামা ধর্মাবলম্বীদের দেওয়া হয়েছে বরাদ্দের প্রায় ৬০ শতাংশ টাকা।

​বিতরণে এই বৈষম্য ও অর্থ কেটে রাখার ঘটনায় স্থানীয় সুফলভোগী ও বৌদ্ধ ভিক্ষুদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

​উপজেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতি বছরের ন্যায় এবারও ত্রাণ ও পুনর্বাসন অধিদপ্তর এবং মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে থানচির ৪টি ইউনিয়নের ৮১টি বৌদ্ধবিহার এবং ২টি শারদীয় দুর্গাপূজা মণ্ডপসহ মোট ৮৩টি প্রতিষ্ঠানের জন্য ৬০০ কেজি করে মোট ৪৯.৮০০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়।

​গত মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) দুপুরে উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে আনুষ্ঠানিকভাবে সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের হাতে বরাদ্দের ডেলিভারি আদেশ (ডিও) হস্তান্তর করার কথা ছিল।

​তবে অভিযোগ উঠেছে, ডিও বিতরণের সময় উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যালয়ের অফিস সহকারী মো. শরিফুল ও রুবেলের কাছ থেকে প্রভাব খাটিয়ে রেমাক্রী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মুইশৈথুই মারমা (রনি) এবং পার্বত্য মন্ত্রীর প্রতিনিধি মংশৈম্রাই মারমা ৭৯টি ডিও হস্তগত করেন। এর মধ্যে রেমাক্রী ও তিন্দু ইউনিয়নের ৩৪টি এবং থানচি ও বলিপাড়া ইউনিয়নের ৪৫টি ডিও ছিল। পরবর্তীতে এসব ডিও ডিলারের কাছে বিক্রি করে টাকা উত্তোলন করা হয়। বাকি ৪টি ডিও (মৈত্রী শিশু সদন, করুণা শিশু সদন ও দুটি দুর্গা মন্দির) সরাসরি সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিরা গ্রহণ করেন।

​চাল উত্তোলন না হয়ে কেন নগদ টাকা?

​বিহার পরিচালনা কমিটির সভাপতিদের মতে, বিতরণ অনুষ্ঠানে খাদ্য নিয়ন্ত্রক ও খাদ্য গুদামের কর্মকর্তারা অনুপস্থিত থাকার কারণেই কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে একটি সিন্ডিকেট তৈরি করা হয়েছে। গত তিন দিন ধরে উপজেলা খাদ্য গুদামের কর্মকর্তা মো. ইসমাইল এবং খাদ্য নিয়ান্ত্রক কার্যালয়ের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা মো. জহিরুল হকের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের পাওয়া যায়নি।

​রেমাক্রী ইউনিয়নের ক্যবু পাড়া বৌদ্ধবিহারের অধ্যক্ষ উ. অগ্রবংশ ভিক্ষু, রেমাক্রী বাজার বৌদ্ধবিহারের অধ্যক্ষ উ. সুচিত্ত্বা মহাথেরো এবং কোয়াইক্ষ্যং পাড়া বিহারের অধ্যক্ষ উ. পয়ঞাজতা ভিক্ষু রা জানান, গুদাম কর্মকর্তারা না থাকায় কোনো উপায় না পেয়ে রেমাক্রী ইউপি চেয়ারম্যান ও মন্ত্রীর প্রতিনিধির কথা অনুযায়ী তাঁরা ডিও বিক্রি করতে বাধ্য হন। ৬০০ কেজি চালের বিপরীতে ২১,৬০০ টাকা পাওয়ার কথা থাকলেও তাঁদের দেওয়া হয়েছে মাত্র ১৫,০০০ টাকা।

​তারা আরও জানান, প্রতি বিহার থেকে অফিস খরচ বাবদ ১,০০০ টাকা এবং উপজেলাভিত্তিক যুব সম্প্রদায়ের প্রবারণা উৎসব উদ্যাপন কমিটির জন্য ১,৫০০ টাকা রেখে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাকি টাকা না দিয়ে আমাদের মাত্র ১৫,০০০ টাকা হাতে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। এমনকি ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত আমরা জানতামই না যে সরকার অনুদান দেয়; রেমাক্রী ইউপি চেয়ারম্যান আমাদের বলতেন তিনি ব্যক্তিগত পকেট থেকে ৫,০০০ টাকা করে দান করছেন।

​সরেজমিন চিত্র ও ভূতুড়ে বিহারের তালিকা

​তালিকানুসারে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, রেমাক্রী ইউনিয়নের চাইহ্লাউ পাড়া, ক্রাহ্লাঅং পাড়াসহ বেশ কিছু মারমা কার্বারি পাড়ায় কোনো বৌদ্ধবিহার বা ভিক্ষু নেই। একই চিত্র তিন্দু ইউনিয়নের সাউপ্রু পাড়া, ওয়েলাওয়া পাড়া ও ছাংওডং পাড়াতেও।

​পার্বত্য ভিক্ষু পরিষদের থানচি শাখা সভাপতি ও থানচি হেডম্যান পাড়া বৌদ্ধবিহারের অধ্যক্ষ উ. ইউসারাদা মহাথেরো বলেন, আমরা এ বছর ১৯,০০০ টাকা পেয়েছি। তবে আমাদের উপজেলায় প্রকৃত বৌদ্ধবিহারের সংখ্যা মাত্র ৩৭টি। তালিকায় থাকা বাকি বিহারগুলো সম্পর্কে আমাদের কোনো ধারণা নেই।”

​নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক সচেতন নাগরিক জানান, চেয়ারম্যান-মেম্বাররা বরাদ্দ পাওয়ার আশায় বিহার নেই এমন বহু গ্রামের নাম তালিকায় যুক্ত করে ১২০টি বিহারের ভুয়া তালিকা করেছিলেন। এমনকি ম্রো সম্প্রদায়ের ‘ক্রামা’ প্রার্থনা ঘরকেও (যা প্রবারণা পালন করে না) বৌদ্ধবিহার হিসেবে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

​বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য

​মন্ত্রীর প্রতিনিধি মংশৈম্রাই মারমা: আমি ৪৫টি ডিও লেটার পিআইও কার্যালয় থেকে নিয়েছি এবং প্রতি কেজি চাল ৩৬ টাকা দরে বিক্রি করেছি। প্রতি বিহারের জন্য ১৯,১০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে ভাঙতি টাকা না থাকায় সবাইকে ১৯,০০০ টাকা করে নিজ হাতে পৌঁছে দিয়েছি।”

​স্থানীয় চালের ডিলার আলী হোসেন: আমার ড্রাইভার প্রতি কেজি ৩৭ টাকা দরে চাল কিনেছে। আমি ৬৯টি বৌদ্ধবিহারের জন্য ২২,২০০ হাজার দুইশত টাকা হারে মোট ১৫ লাখ ৩১ হাজার ৮০০ টাকা মন্ত্রীর প্রতিনিধি ও রেমাক্রী চেয়ারম্যানের হাতে বুঝিয়ে দিয়েছি।”

​রেমাক্রী ইউপি চেয়ারম্যান মুইশৈথুই মারমা (রনি) অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, আমি চালের ব্যবসায়ী নই, আর ডিও-এর আশেপাশেও ছিলাম না। সব ডিও মন্ত্রীর প্রতিনিধি মংশৈম্রাই নিয়েছেন।

​থানচি সদর ইউপি চেয়ারম্যান অংপ্রু ম্রো: সদর ইউনিয়নের ম্রো সম্প্রদায়ের ২৫টি ক্রামা ক্যাংঘর ও মারমাদের ১০টি বৌদ্ধবিহারসহ মোট ৩৫টি প্রতিষ্ঠান বরাদ্দ পেয়েছে। মারমা বিহারের টাকা মংশৈম্রাই তদারকি করেছেন। ক্রামা ক্যাংঘরের বরাদ্দ থেকে টাকা কেটে যে ৬টি স্থানে ঘর নেই, সেসব গ্রামের মাঝে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে।

​উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মশফিকুর রহমান: প্রাথমিক যাচাই-বাছাই ও গোয়েন্দা তথ্যের পর ৮১টি বিহার ও ২টি মন্দিরের নাম চূড়ান্ত করা হয়। অনুষ্ঠানিকভাবে ডিও হস্তান্তর করা হয়েছিল, পরে তারা কী করেছে তা আমাদের জানা নেই। তবে কার্যালয়ের নামে কোনো টাকা রাখা হয়নি। কর্মচারী টাকা নিয়ে থাকলে তা ফেরত দেওয়া হবে এবং লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।