১১সেপ্টেম্বর ২০২৬
পাহাড়ের নীরবতা ভেঙে একসময় ভেসে আসত তাঁতের ছন্দময় শব্দ। ঘরের উঠানে বসে নারীরা কোমরের সঙ্গে তাঁত বেঁধে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বুনতেন রঙিন কাপড়। সেই কাপড়ের প্রতিটি সুতা, প্রতিটি নকশা আর প্রতিটি রঙে ফুটে উঠত পাহাড়ি মানুষের জীবন, সংস্কৃতি ও স্বকীয় পরিচয়। কিন্তু সময়ের নির্মম পরিবর্তনে সেই দৃশ্য এখন প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে।
বান্দরবানের থানচি উপজেলার দুর্গম হাঁনারাং এলাকায় এখনো সেই পুরোনো ঐতিহ্য আঁকড়ে ধরে আছেন হাঁবৈরুং ত্রিপুরা। সংসারের কাজ শেষ করে তিনি বসেন কোমর তাঁত নিয়ে। কোমরের সঙ্গে বাঁধা তাঁত, সামনে রঙিন সুতা—দুই হাতের নিপুণ টানে ধীরে ধীরে কাপড়ে ফুটে ওঠে নকশা। তাঁর হাত থামে, সুতা ঠিক হয়, আবার শুরু হয় বুনন। এভাবেই দিনের পর দিন, বছরের পর বছর ধরে চলছে তাঁর সংগ্রাম।
কিন্তু প্রশ্ন উঠছে—হাঁবৈরুংয়ের পর এই তাঁত ধরবে কে?
একসময় হাঁনারাংসহ পাহাড়ের বিভিন্ন জনপদের প্রায় প্রতিটি ঘরেই ছিল কোমর তাঁত। জুমের কাজ, সংসারের দায়িত্ব ও নানা ব্যস্ততার মাঝেও নারীরা অবসর পেলেই তাঁত নিয়ে বসতেন। নিজেদের পরনের কাপড় নিজেরাই তৈরি করতেন। সেই কাপড় শুধু শরীর ঢাকার উপকরণ ছিল না; ছিল নিজেদের সংস্কৃতির পরিচয়, ছিল পূর্বপুরুষের রেখে যাওয়া ঐতিহ্যের জীবন্ত দলিল।
মা থেকে মেয়ে, দাদি থেকে নাতনি—এভাবেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ছড়িয়ে পড়ত তাঁত বোনার কৌশল। কোন সুতায় কোন রং বসবে, কীভাবে নকশা ফুটিয়ে তুলতে হবে, কোন বুননে কাপড় হবে শক্ত ও আকর্ষণীয়—এসব ছিল অভিজ্ঞতার শিক্ষা। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বই নয়, পরিবারের নারীদের হাতই ছিল এই শিল্পের বিদ্যালয়।
একসময় একজন পাহাড়ি নারীর জীবনদক্ষতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবেও বিবেচিত হতো তাঁত বোনার জ্ঞান। বিয়ের আগে নিজের পোশাক নিজ হাতে তৈরি করতে পারা ছিল গর্বের বিষয়। ফলে কোমর তাঁত ছিল নারীর সৃজনশীলতা, আত্মনির্ভরতা ও পারিবারিক ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
কিন্তু আধুনিকতার ঢেউ পাহাড়ের জীবনেও বদলে দিয়েছে সেই চিত্র।
বাজারে এখন অল্প সময়ে ও তুলনামূলক সহজে তৈরি পোশাক পাওয়া যায়। ফলে দিনের পর দিন শ্রম দিয়ে হাতে কাপড় বোনার প্রয়োজন অনেকটাই কমে গেছে। নতুন প্রজন্মের কাছে দীর্ঘ সময় ধরে তাঁত বোনা অনেক সময় কঠিন ও অনাকর্ষণীয় মনে হয়। তার ওপর রয়েছে সবচেয়ে বড় সংকট—এই শ্রমের নিশ্চিত বাজার নেই, নিশ্চিত আয়ও নেই।
একজন নারী দিনের পর দিন পরিশ্রম করে একটি কাপড় তৈরি করলেও সেটি বিক্রি হবে কি না, কত দামে বিক্রি হবে—তার নিশ্চয়তা নেই। ফলে অর্থনৈতিক বাস্তবতার কাছে হার মানছেন অনেকেই। ঐতিহ্যকে ভালোবাসলেও জীবিকার নিশ্চয়তা না থাকায় নতুন প্রজন্মের অনেক নারী আর এই শিল্প শেখার আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।
ফলে একদিকে আধুনিক পোশাকের বাজার বিস্তৃত হচ্ছে, অন্যদিকে নিঃশব্দে সংকুচিত হচ্ছে পাহাড়ের ঐতিহ্যবাহী কোমর তাঁত।
হাঁবৈরুং ত্রিপুরার হাতে এখনো সেই ঐতিহ্যের স্পন্দন। তাঁর তাঁতে তৈরি প্রতিটি কাপড় যেন বলে যায় হারিয়ে যেতে বসা এক সময়ের গল্প। সুতা টানার প্রতিটি মুহূর্তে রয়েছে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, ধৈর্য ও নিখুঁত দক্ষতা। একটি নকশায় সামান্য ভুল হলেও পুরো বুননের সৌন্দর্য নষ্ট হতে পারে। তাই এই কাজ কেবল হাতের শ্রম নয়—এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রজন্মের পর প্রজন্মের অর্জিত জ্ঞান।
পাহাড়ি পোশাকের বৈচিত্র্যময় রং ও নকশার পেছনে রয়েছে এমন অসংখ্য নারীর অদৃশ্য শ্রম। তাঁদের হাতেই তৈরি হয়েছে স্বতন্ত্র পোশাক, টিকে থেকেছে সাংস্কৃতিক পরিচয়। কিন্তু সেই হাতগুলো যদি একে একে থেমে যায়, তাহলে শুধু একটি তাঁতশিল্প নয়—হারিয়ে যাবে পাহাড়ি সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক অধ্যায়।
ঐতিহ্যকে শুধু জাদুঘরে তুলে রেখে বাঁচানো যায় না—তাকে জীবিকার সঙ্গে যুক্ত করতে হয়।
স্থানীয়দের দাবি, কোমর তাঁতকে টিকিয়ে রাখতে হলে প্রশিক্ষণের পাশাপাশি তৈরি করতে হবে স্থায়ী বাজার। তাঁতিদের উৎপাদিত কাপড়ের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, অনলাইন ও পর্যটনকেন্দ্রিক বাজারে বিপণনের সুযোগ তৈরি করা এবং সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে আর্থিক সহায়তা দেওয়া জরুরি। তাহলেই এই শিল্প নতুন প্রজন্মের কাছে আবারও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।
নইলে হাঁবৈরুং ত্রিপুরার মতো হাতে গোনা কয়েকজন তাঁতিকে ঘিরেই সীমাবদ্ধ থাকবে এই ঐতিহ্য। একসময় হয়তো তাঁদের হাতও থেমে যাবে। সঙ্গে থেমে যাবে কোমর তাঁতের সেই পরিচিত শব্দ।
তখন পাহাড়ের ঘরে ঘরে হয়তো কাপড় থাকবে, কিন্তু থাকবে না নিজ হাতে বোনা সেই কাপড়ের গল্প। থাকবে না প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা সেই সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার।
হাঁবৈরুংয়ের কোমর তাঁত তাই শুধু একটি তাঁত নয়—এটি হারিয়ে যেতে বসা পাহাড়ি ঐতিহ্যের শেষ প্রহরের এক নীরব প্রতীক।

উশৈনু মারমা
থানচি, বান্দরবান
মোঃ০১৮৫৬৪৬২৬৮০/০১৫৫৪৫৩৫৪৩৭