মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চরম অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা এবং দালাল চক্রের দৌরাত্ম্যে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা পাওয়ার মৌলিক অধিকার মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ল্যাবরেটরিতে কর্তব্যরতদের অনুপস্থিতি, টিকিট কাউন্টারে অনিয়ম, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের কমিশন বাণিজ্যে পুরো হাসপাতালজুড়ে এক প্রকার অরাজক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। সরকারি সুযোগ-সুবিধা ও আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকার পরও সাধারণ রোগীরা বাধ্য হচ্ছেন অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে বাইরে যেতে।
সকাল পৌনে ১১টাতেও ল্যাব শূন্য, রয়েছে কমিশন বাণিজ্য
হাসপাতালে সরকার প্রদত্ত উন্নতমানের পরীক্ষা-নিরীক্ষার আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকলেও এর সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন রোগীরা। সরেজমিনে দেখা যায়, সকাল পৌনে ১১টা বেজে গেলেও রক্তসহ বিভিন্ন পরীক্ষার ল্যাবরেটরিতে কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মী উপস্থিত নেই। শূন্য পড়ে রয়েছে ল্যাবের টেবিল ও চেয়ার। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে সেবা না পেয়ে রোগীরা বাধ্য হয়ে চড়া মূল্যে বাইরের ডায়াগনস্টিক সেন্টারের শরণাপন্ন হচ্ছেন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ল্যাবের দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক তাসলিমা ও সংশ্লিষ্ট কর্মীদের বিরুদ্ধে রোগীদের সাথে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। সরকারি সেবায় ইচ্ছাকৃত দীর্ঘসূত্রিতা তৈরি করা হয়, যাতে রোগীরা বাধ্য হয়ে নির্দিষ্ট কিছু ক্লিনিকে যান। এর পেছনে রয়েছে হাসপাতালটির অসাধু কর্মচারী এবং বাইরের ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর একটি শক্তিশালী কমিশন সিন্ডিকেট।
টিকিট কাউন্টারে স্বজনপ্রীতি ও বিশৃঙ্খলা
বহির্বিভাগের টিকিট কাউন্টারেও সেবাপ্রত্যাশীদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। রোগীরা ভোররাত থেকে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকলেও কাউন্টারের ভেতরে থাকা অসাধু কর্মী ও দালাল চক্র পেছনের দরজা দিয়ে নিয়ম ভেঙে নিজেদের লোকজনকে আগে টিকিট পাইয়ে দিচ্ছে। এতে ঘণ্টার পর লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা প্রকৃত ও দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগীরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
পরিবেশ সংকট ও এডিস মশার আঁতুড়ঘর
সংক্রামক ব্যাধি প্রতিরোধের আশ্রয়স্থল হওয়ার কথা থাকলেও লৌহজং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চারপাশ এখন ময়লা-আবর্জনার স্তূপে পরিণত হয়েছে। অপরিকল্পিত জঞ্জাল ও জমে থাকা পানির কারণে এটি এখন এডিস মশার আঁতুড়ঘরে রূপ নিয়েছে। কিছুদিন পরিচ্ছন্নতার উদ্যোগ নেওয়া হলেও বর্তমানে তা পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।
হাসপাতালের অভ্যন্তরের চিত্রও অত্যন্ত নাজুক। রোগীদের বেডগুলোর অবস্থা বেহাল ও অপরিচ্ছন্ন। বিশেষ করে রোগীদের ব্যবহার্য বাথরুমগুলোর অবস্থা ভয়ংকর; দীর্ঘদিন পরিষ্কার না করায় মেঝে ও স্যানিটারি ফিটিংসের ওপর ময়লার পুরু আস্তরণ জমেছে, যা থেকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।
ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের অবাধ রাজত্ব
হাসপাতালের কর্মঘণ্টার ভেতরেই বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানি ও বাইরের ডায়াগনস্টিক সেন্টারের প্রতিনিধিদের অবাধ উপস্থিতি ও ভিড় লেগেই থাকে। সম্প্রতি হাসপাতালে দুজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পদায়নের খবরে স্থানীয়দের মাঝে সেবার মান নিয়ে আশার সঞ্চার হলেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চরম অবহেলা ও নৈরাজ্যে তা এখন হতাশায় পর্যবসিত হয়েছে।
হাসপাতালটির এই অচলাবস্থা, দায়িত্ব পালনে অনীহা এবং কমিশন বাণিজ্য অবিলম্বে বন্ধ করতে এবং সেবার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে ঊর্ধ্বতন প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের কঠোর হস্তক্ষেপ ও নিরপেক্ষ বিভাগীয় তদন্ত দাবি করেছেন স্থানীয় সুশীল সমাজ ও ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ।