জামালপুর সদর উপজেলার দিগপাইত ইউনিয়নের হবদেশ গ্রামে এক চাঞ্চল্যকর প্রতারণা ও সর্বস্ব লুটে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। রাস্তার ইট তুলে বিক্রির মামলার এক আসামিকে আশ্রয় দেওয়ার প্রতিফলে আশ্রয়দাতা বন্ধু আসাদ মিয়াকে (৩৫) সুকৌশলে মাদক সেবন করিয়ে মাতাল বানিয়ে তার বসতঘর ও মূল্যবান আসবাবপত্র বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তাঁরই দুই বন্ধুর বিরুদ্ধে।
​অভিযুক্ত ব্যক্তিরা হলেন হবদেশ গ্রামের নাছির আলীর পুত্র মো. জনি (৩০) এবং মৃত গফুর আলীর পুত্র মো. ময়নাল (৩২)। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত জনি ও ময়নাল এলাকায় যুবদল নেতা হিসেবে পরিচিত হলেও রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা বিভিন্ন অপকর্ম ও মাদক সেবনের সাথে জড়িত।
​নেশাগ্রস্ত করে ঘরবাড়ি বিক্রি
স্থানীয় সূত্রের তথ্যানুযায়ী, গত ৩১ জুলাই শুক্রবার ঘরটির ক্রেতা বেলাল হোসেন (৩৫) দলবল নিয়ে আসাদের ঘরটির টিনের চালা, বেড়া, বাথরুম ও অধিকাংশ আসবাবপত্র ভেঙে নিয়ে যান। খবর পেয়ে আসাদ মিয়ার স্ত্রী বেলি বেগম বাবার বাড়ি থেকে নিজ বাড়িতে ছুটে এসে ঘর ভাঙতে বাধা দেন। ক্রেতা বেলাল হোসেনের কাছে কারণ জানতে চাইলে তিনি জানান, তিনি ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকার বিনিময়ে এই ঘর কিনেছেন। এছাড়া ঘরের অন্যান্য মূল্যবান আসবাবপত্র জনি ও ময়নাল নিয়ে গেছেন।
​ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ে ক্রেতা বেলাল হোসেনের বাড়িতে গিয়ে ঘরের টিন, সিমেন্টের খুঁটি ও অন্যান্য মালামাল পাওয়া যায়। ঘর বিক্রির বিষয়ে জানতে চাইলে বেলাল হোসেন জানান, বিক্রির সময় ঘরের মালিক আসাদ, জনি ও ময়নাল—তিনজনেই উপস্থিত ছিলেন। চুক্তির প্রথম ৩৫ হাজার টাকা জনি নিয়েছেন এবং বাকি ১ লাখ টাকা স্থানীয় মাতব্বর চান মিয়া ওরফে চান্দের কাছে দেওয়া হয়েছে। তবে টাকা লেনদেন বা ঘর বিক্রির কোনো লিখিত দলিলের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, প্রতিবেশী হওয়ায় পারস্পরিক বিশ্বাসের খাতিরে কোনো কাগজপত্র করা হয়নি।
​বখাটেপনা ও সুদের চক্র
স্থানীয়দের অভিযোগ, জনি ও ময়নাল এলাকার চিহ্নিত বখাটে ও মাদকসেবী। আসাদের স্ত্রী বাড়িতে না থাকার সুযোগ নিয়ে তারা আসাদকে কয়েক দফায় ইয়াবা সেবন করায়। আসাদ চরম নেশাগ্রস্ত ও মাতাল হয়ে পড়লে তারা সুকৌশলে তার ঘর ও আসবাবপত্র বিক্রির আয়োজন করে। জানা গেছে, প্রায় ছয় মাস আগে জনির কাছ থেকে মাসিক সুদে ৩০ হাজার টাকা ধার নিয়েছিলেন আসাদ। এর বিপরীতে তিনি নিয়মিত দুই মাস ৩ হাজার টাকা করে সুদও পরিশোধ করেন।
​কান্নায় ভেঙে পড়েছেন ভুক্তভোগী পরিবার
সর্বস্ব হারিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে আসাদের স্ত্রী বেলি বেগম বলেন, “আমরা স্বামী-স্ত্রী ও দুই মেয়ে ঢাকায় থেকে গার্মেন্টস ও বাসা বাড়িতে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে ৩ লক্ষ টাকা খরচ করে এই ঘরবাড়ি তৈরি করেছিলাম। মেয়েদের বিয়ের জন্য ২ ভরী স্বর্ণের গহনা জমিয়েছিলাম—যার মধ্যে রয়েছে ১২ আনার একটি গলার চেন এবং ৩ জোড়া কানের দুল। এছাড়া ৪০ হাজার টাকা দামের খাট, ১৫ হাজার টাকার সুকেজসহ ঘরের আসবাবপত্র এবং চালের টিন সবকিছু জনি ও ময়নাল লুট করে নিয়ে গেছে। আমরা এখন কোথায় থাকব? তারা আমাদের সবকিছু শেষ করে দিয়েছে।”
​প্রতিবেশী এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, ঘটনার আগের দুই দিন ধরে আসাদ কারও সাথে কথা বলছিলেন না, শুধু কাঁদছিলেন। হঠাৎ করেই এক ব্যক্তি এসে ঘর ভেঙে নিয়ে যেতে দেখা যায়। তখন আসাদকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বিড়বিড় করে জানান, তিনি কিছু বুঝছেন না এবং জানেন না। পরবর্তীতে মাদকের প্রভাব কেটে হুঁশ ফেরার পর তিনি বিষয়টি বুঝতে পারেন।
​এলাকাবাসীর ক্ষোভ
নিরক্ষর ও সহজ-সরল আসাদকে মাদক খাইয়ে নিঃস্ব করার এই ঘটনায় হবদেশ গ্রামসহ পুরো এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে এই অপকর্ম ও প্রতারণার সাথে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল ও এলাকাবাসী।