নিজস্ব প্রতিবেদক:
যাকে ঘিরে ময়মনসিংহের জারী-সারী গানের ইতিহাস বদলে গিয়েছিল
কারাগারের অন্ধকার কক্ষ থেকেই যিনি কণ্ঠে তুলে এনেছিলেন জীবনের কষ্ট,অপমান আর বাস্তবতার সুর,তিনি আর কেউ নন,চাঁন বয়াতি।
জামালপুর জেলার মেলান্দহ উপজেলার চরপলিশা গ্রামে ১৯৪৭ সালের ১০ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন বাউল সম্রাট চাঁন বয়াতি।
তার প্রকৃত নাম ছিল চাঁন মিয়া।জন্মের পর খুব অল্প বয়সেই তিনি মাকে হারান,বাবার দ্বিতীয় বিয়ের পর পারিবারিক অশান্তি ও সৎ মায়ের নির্যাতনের কারণে
শৈশবেই তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং অল্প বয়সেই ঘর ছাড়তে বাধ্য হন
এরপর তিনি বাউল ও জারী গানের দলে যুক্ত হয়ে গ্রাম-গঞ্জে ঘুরে ঘুরে গান পরিবেশন করতে শুরু করেন
ধীরে ধীরে তার কণ্ঠ ও গানের ভঙ্গি মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেয় এবং তিনি বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে পরিচিত লোকসংগীত শিল্পীতে পরিণত হন।
তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক অধ্যায় শুরু হয় ১৯৮৬ সালের দিকে
যখন তিনি একটি মামলায় কারাবন্দি হন সেই কারাগারের অভিজ্ঞতা তার জীবন ও সঙ্গীতকে সম্পূর্ণভাবে বদলে দেয়।
কারাগারের অন্ধকার কক্ষে বসেই তিনি নিজের জীবনের কষ্ট অপমান ও বাস্তব অভিজ্ঞতা নিয়ে রচনা করেন তার সবচেয়ে বিখ্যাত জারী গান “ম্যাজিস্ট্রেট শামসুল হক আমায় জামিন দিল না।
কারাগারের ভেতরে তিনি থালা, বাটি, গ্লাস ও চামচকে বাদ্যযন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে গান পরিবেশন করেন
তার সেই আবেগঘন কণ্ঠ জেলের দেয়াল পেরিয়ে বাইরে ছড়িয়ে পড়ে
পরবর্তীতে এই গান টেপ রেকর্ডে ধারণ হয়ে ক্যাসেট আকারে বাজারে আসে এবং সারা দেশে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। এই ঘটনার পর চাঁন বয়াতি রাতারাতি লোকসংগীতের এক কিংবদন্তিতে পরিণত হন।
তবে এই জনপ্রিয়তার পরও তার জীবন সহজ ছিল না একাধিক মামলার জটিলতা,দীর্ঘ আইনি লড়াই এবং অর্থনৈতিক সংকট তাকে সারাজীবন কষ্ট দিয়েছে গান গেয়েই তিনি জীবিকা নির্বাহ করতেন কিন্তু মামলার খরচ ও দারিদ্র্য তাকে প্রায় নিঃস্ব করে দেয়,তার উল্লেখযোগ্য জারী গানের মধ্যে রয়েছে— জেলখানার জারী,মনছুর হিল্লার জারী, মা ফাতেমা (রাঃ)-এর জারীসহ অসংখ্য জনপ্রিয় লোকগীতি, যা ময়মনসিংহ অঞ্চলের জারী-সারী সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে।
জীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি চরম অসুস্থতা ও অভাবের মধ্যেও লোকসংগীতকে আঁকড়ে ধরে ছিলেন অনেক সময় সরকারি সহযোগিতা না পেয়েও তিনি নিজের আত্মসম্মান বজায় রেখে চলে ছিলেন।
অবশেষে ২০১৬ সালের ৯ আগস্ট তিনি তার জন্মভূমি মেলান্দহে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বাংলার লোকসংগীতের এই অমর কণ্ঠ—চাঁন বয়াতি আজও বেঁচে আছেন মানুষের হৃদয়ে,তার গাওয়া জারী গানের মধ্য দিয়ে।